সয়াবিন তেল-ইউরিয়া-ডিটারজেন্টে ‘দুধ’, বিপর্যয়ের মুখে পাবনার দুগ্ধশিল্প

গরু ছাড়াই দুধ উৎপাদনের অভিযোগ, চিলিং সেন্টারে সরবরাহের দাবি; খাঁটি দুধের বাজার হারাচ্ছেন প্রকৃত খামারিরা

সয়াবিন তেল-ইউরিয়া-ডিটারজেন্টে ‘দুধ’, বিপর্যয়ের মুখে পাবনার দুগ্ধশিল্প
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

গরু নেই, খামার নেই—তবু প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে মণকে মণ ‘দুধ’। পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, সাঁথিয়া ও বেড়া এলাকায় কৃত্রিম উপায়ে দুধ তৈরির একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার, কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে কথিত ‘উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধ’। পরে এসব তরল বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করা হচ্ছে।

 

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে দুধের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র কৃত্রিম দুধ তৈরি করে বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকৃত খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯২টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। সাঁথিয়া, বেড়া ও বাঘাবাড়ী এলাকাতেও রয়েছে আরও অনেক দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণকেন্দ্র।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কারবারি সাধারণ সাদা তরলকে বিভিন্ন রাসায়নিকের মাধ্যমে দুধের মতো রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় কয়েকজন কারবারির ভাষ্য অনুযায়ী, ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা তরলে প্রায় ৪৫০ টাকার রাসায়নিক ব্যবহার করে সেটিকে বেশি ফ্যাটযুক্ত দুধ হিসেবে বাজারজাত করা যায়। এরপর ওই পরিমাণ তরল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে তাদের দাবি। ফলে অল্প বিনিয়োগে বড় মুনাফার সুযোগ তৈরি হওয়ায় একটি চক্র এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কারবারিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব রাসায়নিক দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন বা অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। কুরিয়ার বা পরিবহন ব্যবস্থায় সেগুলো সংশ্লিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়। এরপর কৃত্রিমভাবে তৈরি তরল দুধ বিভিন্ন সংগ্রহকেন্দ্রে সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়ার পেচাকোলা ঘাট এলাকায় উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি ও প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ এবং ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বেড়ার নাকালিয়া ও পেচাকোলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে জয়দেব ঘোষকে জরিমানা করা হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান ও জরিমানার মাধ্যমে এ ধরনের কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। রাসায়নিকের অবাধ বিপণন, পরিবহন এবং ভেজাল দুধ সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।

ভেজাল দুধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রকৃত দুগ্ধ খামারিরা। খামারিদের অভিযোগ, খাঁটি দুধ উৎপাদনে খরচ বেশি হওয়ায় তারা বাজারে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে কম দামে কৃত্রিম দুধ সরবরাহের সুযোগ থাকায় কিছু সংগ্রাহক ও মধ্যস্বত্বভোগী প্রকৃত খামারিদের দুধ নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।

বাওইখোলা গ্রামের দুগ্ধ খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, খামারিরা বর্তমানে প্রতি লিটার দুধ ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। তাঁর অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে নকল দুধ বাজারে ছাড়ায় প্রকৃত খামারিদের বাজার নষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না এবং পুরো অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লিটার। ফলে প্রতিদিন আনুমানিক ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার দুধের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উৎপাদিত দুধের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে যায়। মিল্ক ভিটা, আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, পাইকার, মিষ্টির দোকান এবং স্থানীয় বাজারে এই দুধ সরবরাহ করা হয়। চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়েই অসাধু চক্র কৃত্রিম দুধ বাজারে ঢোকাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাঁথিয়ার স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, প্রকৃত খামারিরা সাধারণত দুধে ভেজাল মেশান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী এ ধরনের কাজ করে থাকেন বলে তিনি দাবি করেন। চিলিং সেন্টারে দুধের মান যাচাই আরও কঠোর করা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রাণ ডেইরির ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) সৈকত শেখ দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে। ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এলএস মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে একাধিক ধাপে দুধ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ভেজাল বা মানের ত্রুটি ধরা পড়লে দুধ গ্রহণ করা হয় না।

তিনি আরও বলেন, ভেজাল দুধ গ্রহণ না করায় গত এক বছরে তাদের কয়েকজন চিলিং সেন্টারকর্মী অসাধু চক্রের হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কঠোরতা দিয়ে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাসায়নিকের বিপণন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সব দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন মান যাচাই পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট এসওপি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক ডা. সাইদুল ইসলাম জানান, মিল্ক ভিটার চিলিং সেন্টারগুলোতে দুধ সংগ্রহের সময় ফ্যাট, এসএনএফসহ বিভিন্ন মানদণ্ড পরীক্ষা করা হয়। ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি শনাক্তের জন্যও পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো নমুনায় ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে তা বাতিল করা হয়।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাকৃতিক দুধে বিভিন্ন উপাদানের একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। কৃত্রিমভাবে দুধের চর্বির মাত্রা পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও প্রকৃত দুধের গঠন ও পুষ্টিমান নকল করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু পরীক্ষায় ভেজাল শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এ জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন। দুধে পানি, ইউরিয়া, ক্ষার বা ফর্মালডিহাইডের মতো উপাদান রয়েছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য পৃথক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদও রাসায়নিকযুক্ত নকল দুধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ভোজ্য তেল, ডিটারজেন্ট বা কস্টিক সোডাসহ অনুপযোগী রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি তরল মানুষের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন দূষিত খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

পাবনায় ভেজাল দুধ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো আধুনিক পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধতা। জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও দুধে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক শনাক্তের জন্য আধুনিক ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন।

তিনি জানান, বর্তমানে রাজশাহী থেকে ভ্রাম্যমাণ ল্যাব মাসে একবারের মতো আসে। পাবনায় একটি স্থায়ী পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা গেলে দুধে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভেজাল দুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে শুধু অভিযান ও জরিমানা নয়—দুধ সংগ্রহকেন্দ্রে বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষা, রাসায়নিকের বিক্রি ও পরিবহনে নজরদারি, স্থায়ী পরীক্ষাগার স্থাপন এবং প্রকৃত খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে একদিকে ভোক্তার খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দুগ্ধশিল্পও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জেলা

সুত্র: অনলাইন গণমাধ্যমসমুহ/জনস্বার্থে প্রকাশিত