ভোজ্যতেলে ভয়াবহ কারচুপিঃ নারায়ণগঞ্জে বিএসটিআইয়ের অভিযানে ৬ লাখ টাকা জরিমানা
৪৫০ মিলিতে কম ১৩৫, ১৮০০ মিলিতে কম ৬৬০ মিলি—নারায়ণগঞ্জে বিএসটিআইয়ের অভিযানে ৬ লাখ টাকা জরিমানা
হাতিম বাদশাঃ
ভোজ্যতেলে পরিমাপে ভয়াবহ কারচুপি, বিএসটিআইয়ের সনদ ছাড়াই পণ্য বাজারজাত, মোড়কজাতকরণে অনিয়ম এবং লেবেলে অনুমোদন ছাড়া বিএসটিআইয়ের স্ট্যান্ডার্ড চিহ্ন ব্যবহারের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দুই প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শুধু ভোজ্যতেল নয়—আমদানিকৃত কসমেটিকস পণ্য থেকে শুরু করে টয়লেট টিস্যু ও ফেসিয়াল টিস্যু পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের বাজারজাত ও উৎপাদন নিয়েও নারায়ণগঞ্জে একের পর এক অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন—বিএসটিআই।

তেলে ৪৫০ মিলিতে কম ১৩৫ মিলি!
গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জের উদ্যোগে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযান পরিচালনাকারীরা জানান, সীমু কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, ৩১৬ তারাব, রূপগঞ্জ-এ ফর্টিফাইড সয়াবিন তেল ও ফর্টিফাইড পাম অলিনের ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়ম পাওয়া যায়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—পরিমাপে কম দেওয়া।
পরীক্ষায় দেখা যায়, যেখানে ৪৫০ মিলি তেল থাকার কথা, সেখানে দেওয়া হচ্ছিল ১৩৫ মিলি কম। ৯০০ মিলি প্যাকেটে কম পাওয়া যায় ২২০ মিলি, আর ১৮০০ মিলির প্যাকেটে কম পাওয়া যায় ৬৬০ মিলি।
অর্থাৎ ভোক্তা যে পরিমাণ পণ্যের মূল্য পরিশোধ করছেন, বাস্তবে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম পণ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
সনদ ছাড়াই পণ্য, লেবেলে বিএসটিআইয়ের চিহ্ন!
অভিযানে আরও অভিযোগ পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় গুণগত মান সনদ গ্রহণ ছাড়াই ফর্টিফাইড সয়াবিন তেল ও পাম অলিন বিক্রি, বিতরণ ও বাজারজাত করছিল।

এছাড়া পণ্য মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন সনদ ছাড়াই তেল মোড়কজাত ও বিক্রয় করা হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
আরও গুরুতর বিষয় হলো—বিএসটিআইয়ের গুণগত মান সনদ ছাড়াই পণ্যের লেবেলে বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড চিহ্ন ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে অভিযানে উল্লেখ করা হয়।

শুধু তাই নয়, ভোজ্যতেলে নির্ধারিত মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন না করার বিষয়টিও ধরা পড়ে।
এসব অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে বিএসটিআই আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ২ লাখ টাকা এবং ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী আরও ২ লাখ টাকা—সর্বমোট ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
পাশাপাশি পণ্য মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন সনদ এবং সিএম লাইসেন্স গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
টিস্যু পেপারেও বড় অনিয়ম
একই অভিযানে নিশু কুক্যি টিস্যু পেপার কোম্পানি লিমিটেড, মুরাপাড়া, রূপগঞ্জ-এও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়।
বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় গুণগত মান সনদ ছাড়াই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টয়লেট টিস্যু ও ফেসিয়াল টিস্যু উৎপাদন ও মোড়কজাত করছিল।
অভিযানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বাজারজাত করা টিস্যু পণ্যের তথ্যও উঠে আসে। এর মধ্যে BRAC Bank, The Ibn Sina Trust, Square Pharmaceuticals Ltd.-এর বিভিন্ন পণ্য, Green Life Hospital Ltd., Asgar Ali Hospital, Hotel Amin Internationalসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পণ্য মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন সনদ ছাড়াই ফেসিয়াল টিস্যু উৎপাদন ও মোড়কজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও পাওয়া যায়।
এসব অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে বিএসটিআই আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ১ লাখ টাকা এবং ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ১ লাখ টাকা, অর্থাৎ সর্বমোট ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
কসমেটিকসের বিরুদ্ধেও অভিযান
এর কয়েকদিন আগে, ২০ আগস্ট ২০২৬, নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরের চাষাড়া এলাকার বালুর মাঠ ও আশপাশে জেলা প্রশাসন নারায়ণগঞ্জ এবং বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জের যৌথ উদ্যোগে আরেকটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়।
সেখানে আমদানিকৃত বিভিন্ন কসমেটিকস পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়াই বিক্রয় ও বিতরণের অভিযোগে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে শপিং মেলা, চাষাড়া, বালুর মাঠ, নারায়ণগঞ্জ প্রতিষ্ঠানটিকে আমদানিকৃত টয়লেট সোপ, স্কিন ক্রিম, হেয়ার অয়েল, আই কেয়ার প্রোডাক্ট, লোশন, লিপস্টিক, নেইলপলিশ, বেবি শ্যাম্পু, বেবি অয়েল, বেবি লোশন, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, ফেসওয়াশ ও বডি ওয়াশসহ বিভিন্ন পণ্যের অনুকূলে বিএসটিআই ছাড়পত্র গ্রহণ না করে বিক্রয়-বিতরণের অভিযোগে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে আঁচল বিউটি ওয়ার্ল্ড, চাষাড়া, বালুর মাঠ, নারায়ণগঞ্জ-কে আমদানিকৃত বিভিন্ন কসমেটিকস পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না থাকা এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
দুই প্রতিষ্ঠানকেই দ্রুত প্রয়োজনীয় বিএসটিআই ছাড়পত্র গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
একদিকে ভোজ্যতেলের পরিমাণে বড় ধরনের ঘাটতি, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় মানসনদ ও নিবন্ধন ছাড়াই পণ্য বাজারজাত—এসব ঘটনা সাধারণ ভোক্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।
কারণ একটি পণ্যের গায়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখা থাকলে ভোক্তা সেই পরিমাণ পণ্য পাওয়ার অধিকার রাখেন। আবার বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে সেটির বৈধতা ও অনুমোদন নিয়েও ভোক্তার আস্থা তৈরি হয়।
তাই অনুমোদন ছাড়া মানচিহ্ন ব্যবহার, কম পরিমাণে পণ্য দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সনদ ছাড়া পণ্য বাজারজাতের অভিযোগ শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়—এটি সরাসরি ভোক্তার অধিকার ও বাজার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত।
অভিযান চলবে
রূপগঞ্জের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন বিএসটিআই প্রধান কার্যালয়, ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাবেকুন নাহার। অভিযানে সহযোগিতা করেন বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক (সিএম) ও অফিস প্রধান কে. এম. হানিফ।
প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রকৌশলী মোঃ মাহমুদুল হাসান রানা, মোঃ রেজানুর রহমান সরকার এবং মোঃ হাফিজুর রহমান।
আর ২০ আগস্টের চাষাড়া অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুনিম সোহানা। প্রসিকিউটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জের ফিল্ড অফিসার (সিএম) মাকসুদা রুনা।
বিএসটিআই জানিয়েছে, জনস্বার্থে নিম্নমানের পণ্য, ভেজাল, পরিমাপে কম দেওয়া, অনুমোদন ছাড়া বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন ব্যবহার এবং পণ্য মোড়কজাতকরণ সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট ও বাজার তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তবে এখন বড় প্রশ্ন—
নারায়ণগঞ্জে যদি একটি অভিযানে ৪৫০ মিলির প্যাকেটে ১৩৫ মিলি, আর ১৮০০ মিলির প্যাকেটে ৬৬০ মিলি পর্যন্ত ঘাটতি ধরা পড়ে, তাহলে দেশের অন্যান্য বাজারে ভোক্তারা যে পরিমাণ পণ্যের মূল্য দিচ্ছেন, বাস্তবে তারা ঠিক ততটুকু পণ্য পাচ্ছেন তো?
ভোক্তার পকেট থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে পণ্যের নির্ধারিত পরিমাণের জন্য। তাই পরিমাপে কারচুপি, অনুমোদনহীন পণ্য ও ভুয়া মানচিহ্নের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়—নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর প্রয়োগই পারে বাজারে ভোক্তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
জনস্বার্থে অভিযান অব্যাহত থাকুক—ভোক্তার অধিকার সুরক্ষিত হোক।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি // বিএসটিআই










