২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার: ইউসিবিএলের সাবেক দুই পরিচালক কারাগারে

২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার: ইউসিবিএলের সাবেক দুই পরিচালক কারাগারে
প্রতীকী ছবি

হোসেন মিন্টু, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান:
ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগে করা মামলায় United Commercial Bank Limited (ইউসিবিএল)-এর সাবেক দুই পরিচালকের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালত এই আদেশ দেন, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি হলেন সাবেক পরিচালক অপরূপ চৌধুরী (৬৫) এবং তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান (৬৬)। তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করেন। তবে শুনানি শেষে বিচারক তাদের আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা Anti-Corruption Commission (দুদক)-এর অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাৎ করা হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, একটি ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ‘ভিশন ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স তৈরি করে সেটিকে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের অক্টোবরে ইউসিবিএলের চট্টগ্রাম পোর্ট শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খাদ্যপণ্য—যেমন গম, হলুদ, ছোলা ও মটর আমদানির অজুহাতে ১৮০ দিনের জন্য টাইম লোন আবেদন করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ঋণ অনুমোদনে নেতিবাচক মতামত ছিল, তবুও পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে ঋণটি পাস হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ঋণের অর্থ সরাসরি ব্যবহার না করে তা একাধিক ‘নামসর্বস্ব’ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল আলফা ট্রেডার্স, ক্লাসিক ট্রেডার্স, মডেল ট্রেডিং এবং ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং।

পে-অর্ডারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর পর তা দ্রুত নগদ উত্তোলন ও স্থানান্তরের মাধ্যমে ছড়িয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তকারীদের মতে, পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পদ কেনা ছাড়াও দেশের ভেতরে কিছু প্রতিষ্ঠানের হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও অর্থ প্রবাহের তথ্য পাওয়া গেছে।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মোট ৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আদালত দুদকের দাখিল করা অভিযোগপত্র গ্রহণ করে। এরপর মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। একই সময় গ্রেফতার এড়ানো আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।

আদালতের অবস্থান

দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা জামিন চাইলেও মামলার গুরুত্ব, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রাথমিক প্রমাণ বিবেচনায় আদালত জামিন দেননি। আদালত মনে করেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযোগগুলো গুরুতর এবং বিচারাধীন অবস্থায় আসামিদের মুক্তি দিলে তদন্ত বা সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর জন্য আগামী ৫ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওইদিন বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা দেশের ব্যাংকিং খাতে শাসনব্যবস্থা (governance) ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করা, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা—এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মামলার অগ্রগতি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম