জলপথেই মুক্তি মিলতে পারে ঢাকার যানজট থেকে: নদী-খাল পুনখনন করে চালুর দাবি ওয়াটার বাস সার্ভিস

অবৈধ দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর প্রাকৃতিক জলপথ—বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করে আধুনিক ওয়াটার বাস চালু করা গেলে কমবে যানজট, দূষণ ও নগরবাসীর দুর্ভোগ।

জলপথেই মুক্তি মিলতে পারে ঢাকার যানজট থেকে: নদী-খাল পুনখনন করে চালুর দাবি ওয়াটার বাস সার্ভিস
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিবেদন:
ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে কর্মঘণ্টা, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণ ও মানসিক চাপ। অথচ একসময় নদী ও খালের শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা ঘিরে ছিল বিস্তৃত জলপথ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাশাপাশি অসংখ্য খাল ছিল নগরীর প্রাণ। সেই জলপথ আজ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় প্রায় মৃত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা মনে করছেন, ঢাকার নদী ও খাল পুনখনন করে আধুনিক ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা গেলে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও ঢাকায় অর্ধশতাধিক খাল ছিল।

এসব খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের কাজই করত না, বরং নৌ-যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ খাল সংকুচিত কিংবা বিলীন হয়ে গেছে।
অনেক খালের ওপর গড়ে উঠেছে স্থাপনা, মার্কেট ও সড়ক। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর চারপাশের নদী ও অভ্যন্তরীণ খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে সেগুলোকে ব্যবহার করে ওয়াটার বাস বা ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা সম্ভব। এতে সড়কের ওপর চাপ অনেকাংশে কমবে।

ধরা যাক—গাবতলী থেকে সদরঘাট, আব্দুল্লাহপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ কিংবা ডেমরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত জলপথে নিয়মিত ওয়াটার বাস চলাচল করলে হাজার হাজার যাত্রী কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।
বিশ্বের অনেক বড় শহরে জলপথভিত্তিক গণপরিবহন অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ইতালির ভেনিস শহরে নৌযানই প্রধান পরিবহন ব্যবস্থা।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে খালপথে ওয়াটার বাস চালু রয়েছে।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ফেরি সার্ভিস নগর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় ঢাকায়ও এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন—
১. নদী ও খাল পুনখনন
ভরাট হওয়া খাল ও নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ড্রেজিং ও পুনখনন করতে হবে।
২. অবৈধ দখল উচ্ছেদ
খাল ও নদীর তীর দখলমুক্ত করতে কঠোর অভিযান চালাতে হবে।
৩. দূষণ নিয়ন্ত্রণ
কারখানা ও ড্রেনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে।
৪. আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ
নিরাপদ ঘাট, টিকিট ব্যবস্থা ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তুলতে হবে।
৫. পরিবেশবান্ধব ওয়াটার বাস
ডিজেলচালিত নৌযানের বদলে বৈদ্যুতিক বা কম দূষণকারী ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
ওয়াটার বাস চালু হলে শুধু যানজট কমবে না, বরং জ্বালানি সাশ্রয়, বায়ুদূষণ হ্রাস এবং পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। নদীকেন্দ্রিক সৌন্দর্য ফিরলে রাজধানীর পরিবেশও হবে বাসযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে শুধু উড়ালসড়ক বা মেট্রোরেল যথেষ্ট নয়; জলপথকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নদী ও খাল রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুব কম। তাই নগরবাসীর দাবি—দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকার জলপথ ফিরিয়ে আনা হোক।
একসময় যে শহর নদী ও খালের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল, সেই ঢাকার ভবিষ্যৎ রক্ষায় আবারও জলপথকেই গুরুত্ব দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

অবৈধ দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর প্রাকৃতিক জলপথ-বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করে আধুনিক ওয়াটার বাস চালু করা গেলে কমবে যানজট, দূষণ ও নগরবাসীর দুর্ভোগ।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি//