সওজ ফরিদপুরে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ

কাজ শুরুই হয়নি, কাগজে শেষ ৭০ শতাংশ—পরিশোধ ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা!

সওজ ফরিদপুরে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

বিশেষ সংবাদদাতা:

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও নথি জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো কাজ শুরু না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে। এসব ভুয়া নথি পরে ব্যবহার করা হয়েছে টাঙ্গাইল ও জামালপুরে বড় প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চয়ন অ্যাসোসিয়েটস নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এই জালিয়াতি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আহলান সুমন তালুকদারের পক্ষে ফরিদপুর অঞ্চলের চারটি ব্রিজে রেট্রোফিটিং কাজের ৭০ শতাংশ সম্পন্ন দেখিয়ে ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ তৈরি করা হয়। বাস্তবে ওই চারটি ব্রিজে কাজ শুরুই হয়নি।

এই ভুয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চয়ন অ্যাসোসিয়েটস টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগে ১৬টি এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ–বাহাদুরঘাট সড়কের বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সমর ব্রিজসহ মোট ১৭টি ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের দরপত্রে অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাইয়ে দিতে ফরিদপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা দরপত্রের নথিতে মিথ্যা তথ্য সংযুক্ত করেন।

দরপত্রের সঙ্গে বিল পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে সিএমএস (সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) দাখিল করা হয়, যা সরকারি বিল পরিশোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল নথি। ওই সিএমএসে স্বাক্ষর করেন ফরিদপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুর রহমান এবং সহকারী প্রকৌশলী এস এম রফিকুল ইসলাম।

সিএমএস নথিতে উল্লেখ করা হয়, ভাঙ্গা–ফরিদপুর মহাসড়কের মাধবপুর, পুখুরিয়া, বাসাগাড়ি ও মানিকনগর এলাকায় অবস্থিত চারটি ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের বিপরীতে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসকে মোট ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

কিন্তু সরেজমিন তদন্তে দেখা গেছে, ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়কে পিচ ঢালাই ও মেরামতের কাজ চললেও আলোচিত চারটি ব্রিজে রেট্রোফিটিংয়ের মূল কোনো কাজ শুরু হয়নি।

এই চার ব্রিজের রেট্রোফিটিংয়ের জন্য সওজ ফরিদপুর থেকে ১২ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়। দরপত্রে চয়ন অ্যাসোসিয়েটস ও ইলেকট্রিক লিমিটেড যৌথভাবে প্রায় ১০ শতাংশ কম দর দিয়ে ১১ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭৪ টাকায় কাজ সম্পন্নের প্রস্তাব দেয়।

গত ১৭ নভেম্বর যৌথ প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বনিম্ন দরদাতা ঘোষণা করে একই দিনে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ১১ মে শেষ হওয়ার কথা। তবে দেড় মাস পার হলেও কাজের অগ্রগতি বলতে ব্রিজের নিচে জন্মানো ঝোপঝাড় পরিষ্কার ছাড়া দৃশ্যমান কিছু নেই। অথচ কাগজে কলমে শুরুতেই ৭০ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে কোটি টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে।

আরও প্রশ্ন উঠেছে, কাজটি যৌথভাবে পেলেও প্রথম বিলের সিএমএস ইস্যু করা হয়েছে শুধুমাত্র চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের নামে।

এ বিষয়ে ফরিদপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার দাবি করেন,

“৭০ শতাংশ বিল পরিশোধের কোনো বৈধ সিএমএস দেওয়া হয়নি। যাচাইয়ের সময় টাঙ্গাইল ও জামালপুর কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে—এগুলো সঠিক নথি নয়।”

তবে একই দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা সিএমএসে স্বাক্ষর করেছেন। এখন অস্বীকার করলেও ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্য বেরিয়ে আসবে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে।”

ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, টাঙ্গাইল ও জামালপুরের ১৭টি ব্রিজের কাজ পাইয়ে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এই জালিয়াতি করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সওজের গোপালগঞ্জ জোনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও জড়িত।

অভিযোগের বিষয়ে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের মালিক আহলান সুমন তালুকদার বলেন,

“আমি দরপত্রে কোনো ভুয়া তথ্য দাখিল করিনি।”

তিনি আরও দাবি করেন, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিকরুল হাসানের সঙ্গে তার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই এবং সেই পরিচয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করেননি।

তবে ঘটনার পরদিনই ঠিকাদারের পক্ষে নিজেকে প্রভাবশালী পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জালিয়াতির বিষয় স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান। তিনি জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে তারা দরপত্রে টিকে থাকতে পারছিলেন না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যই ফরিদপুরের চারটি ব্রিজের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ভুয়া সিএমএস তৈরি করা হয়। একপর্যায়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

প্রকৌশলীদের ভাষায়, পুরোনো ব্রিজ বা স্থাপনা না ভেঙে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়াকে রেট্রোফিটিং বলা হয়। এটি অত্যন্ত কারিগরি ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হওয়ায় দক্ষ প্রকৌশলী ও অভিজ্ঞ ঠিকাদার ছাড়া করা নিরাপদ নয়।

সওজের এক কর্মকর্তা জানান, রেট্রোফিটিং প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয় এবং পরে ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ ভাগাভাগি হয়। আগের সরকারের সময়ে এসব প্রকল্পকে অভ্যন্তরীণভাবে ‘নেতাকর্মী লালন-পালনের কর্মসূচি’ বলেও উল্লেখ করা হতো।

উল্লেখ্য, অতীতে দরপত্র জালিয়াতির অভিযোগে প্রায় ৭০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যাদের বেশিরভাগই এখনও সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে পারছে না।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম