নিষিদ্ধ দুই কোটি টাকার তিন কনটেইনার কৃত্রিম মিষ্টিকারক ঘনচিনি আটক
অতিরিক্ত চিনি শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ এবং দন্ত স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিনি নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা:
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস আমদানি নিষিদ্ধ দুই কোটি টাকার তিন কনটেইনার কৃত্রিম মিষ্টিকারক ঘনচিনি আটক করেছে। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ঢাকা এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরে এ চালান জব্দ করা হয়।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মতিঝিলের জীবন বীমা ভবনে অবস্থিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচ পি ইন্টারন্যাশনাল চীন থেকে সোডা অ্যাশ লাইট ঘোষণায় তিনটি কনটেইনারে এ পণ্য আমদানি করে। গত ১৬ আগস্ট পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় এবং খালাসের জন্য উত্তর কাট্টলীর গোল্ডেন কন্টেইনার লিমিটেডে আনা হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানের খালাস স্থগিত করে এবং ১৬ সেপ্টেম্বর কায়িক পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে নমুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোপ্রযুক্তি কেন্দ্র, খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তিনটি ল্যাবের পরীক্ষাতেই পণ্যটিতে ঘনচিনি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
শিশুখাদ্যে চিনি এক অতি সাধারণ উপাদান। ঘনচিনি বা কিউব চিনি শিশুদের পানীয়, দুধ, দই, পাউরুটি এবং বিভিন্ন খাবারে সাধারণভাবে ব্যবহার করা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনি শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ এবং দন্ত স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিনি নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
ঘনচিনি মূলত স্যাকারোজ থেকে তৈরি হয়। এটি কিউব বা ছোট ঘন আকারে বিক্রি হয়।
শিশুখাদ্যে ব্যবহার:
১. দুধ ও দইয়ের সাথে: স্বাদ বৃদ্ধির জন্য
২. পূর্তি ও পেস্ট্রি: কেক, বিস্কুট, পায়েস ইত্যাদিতে
৩. পানি বা রস: শিশুদের জুস বা অন্যান্য পানীয়ে
৪. চকলেট ও মিষ্টি: সরাসরি খাওয়া বা বিভিন্ন মিষ্টি তৈরিতে
৩. শিশুর স্বাস্থ্য ও বিকাশে প্রভাব
ক. শারীরিক স্বাস্থ্য
১. দাঁতের ক্ষয় (উবহঃধষ ঈধৎরবং): চিনি মুখের ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায়, যা দাঁতের এনামেল নষ্ট করে এবং দাঁতের ক্ষয় ঘটায়।
২. মোটা হওয়ার ঝুঁকি (ঙনবংরঃু): অতিরিক্ত চিনি ফ্যাট হিসেবে জমে, যা শিশুদের অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতার কারণ হয়।
৩. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: উচ্চ চিনি খেলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
খ. মানসিক ও আচরণগত প্রভাব
১. শক্তি বা যুঢ়বৎধপঃরারঃু: চিনি দ্রুত শক্তি প্রদান করলেও তা অতিরিক্ত হলে শিশু যুঢ়বৎধপঃরাব বা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে যেতে পারে।
২. মনোযোগের অভাব: দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত চিনি শিশুদের মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি কমাতে পারে।
গ. পুষ্টিগত প্রভাব
চিনি শুধুমাত্র খালি ক্যালোরি দেয়, কোন প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা খনিজ দেয় না।
এটি শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির গ্রহণ কমাতে পারে।
৪. পরামর্শ ও সীমাবদ্ধতা
১. চিনি ব্যবহার সীমিত করা: ২ বছরের কম শিশুকে চিনি দেওয়া উচিত নয়। ২-১৮ বছরের জন্য দৈনিক চিনি গ্রহণ সীমা ২৫ গ্রাম (প্রায় ৬ চা চামচ) এর বেশি হওয়া উচিত নয়।
২. স্বাস্থ্যকর বিকল্প:
প্রাকৃতিক ফলের রস বা পেস্ট
দুধ ও দইয়ের প্রাকৃতিক মিষ্টি
৩. শিশুকে চিনি অভ্যাসে অভ্যস্ত করা এড়ানো: খাবারে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার না করা।
৪. দাঁতের যত্ন:র চিনি খাওয়ার পর শিশুর দাঁত ব্রাশ করানো।
শিশুখাদ্যে ঘনচিনি ব্যবহার স্বাভাবিক স্বাদের জন্য প্রায়শই ব্যবহৃত হয়, তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর শারীরিক, মানসিক ও পুষ্টিগত বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। সঠিক সীমা এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প নির্বাচন করে শিশুদের সুস্থ ও সুষম বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ঘনচিনি একটি কৃত্রিম মিষ্টিকারক, যা সাধারণ চিনির তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ গুণ বেশি মিষ্টি। এটি বিভিন্ন মিষ্টান্ন, বেকারি, আইসক্রিম, জুস, চকোলেট, কনডেন্সড মিল্ক ও শিশু খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সরকার ঘনচিনি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে এবং এটি আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২০২৪ এর নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী পণ্যচালানটি জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আটক চালানের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা, এবং ঘনচিনির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক করহার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার এইচ এম কবির বলেন, ‘তিন কনটেইনারে আমদানি নিষিদ্ধ ঘনচিনি আটক করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ কাস্টমস কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর পণ্য আমদানির যে কোনো প্রচেষ্টা আইনের আওতায় আনা হবে।’
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// মহানগর










