হালুয়াঘাটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিস্ময়কর জালিয়াতি: ৭৬ শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের সনদে অসঙ্গতি

প্রতিষ্ঠানপ্রধান সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, তদন্তে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি বড় করে দেখা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা প্রত্যেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন।

হালুয়াঘাটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিস্ময়কর জালিয়াতি: ৭৬ শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের সনদে অসঙ্গতি
ছবি: অনলাইন হতে সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠানপ্রধান সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, তদন্তে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি বড় করে দেখা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা প্রত্যেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক | ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে নিয়োগ জালিয়াতি, ভুয়া সনদ, স্বজনপ্রীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিস্তৃত অভিযোগ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথিতে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এসব অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি বেতন-ভাতার বিপুল অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির মোট ৭৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে ৭৩ জনের শিক্ষাগত সনদ, নিবন্ধন সনদ কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্রে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কলেজ শাখার প্রায় সব শিক্ষক এবং স্কুল শাখার অধিকাংশ শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায়।

ডিআইএর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ে অসত্য তথ্য মিলেছে। কারও শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। আবার কয়েকজনের ক্ষেত্রে এমন প্রতিষ্ঠানের সনদ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর অস্তিত্ব বা অনুমোদনের তথ্যও মেলেনি।

তদন্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে ওঠা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাইসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িচালককেও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কিংবা স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী ও উপস্থিতি সংক্রান্ত নথিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিআইএর তদন্তে আরও উঠে এসেছে, নিয়োগের নামে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো। নিয়োগ পাওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার একটি অংশও নিয়মিতভাবে কেটে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে বছরের পর বছর একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনেকের নাম বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যভাণ্ডারে ছিল না। তবে ২০২২ সালে হঠাৎ করেই তাদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা তদন্তকারীদের সন্দেহের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ভুয়া ও অনিয়মিত নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি অর্থ বেতন-ভাতা হিসেবে উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ শাখায় চার কোটির বেশি এবং স্কুল শাখায় এক কোটির বেশি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

ডিআইএ এসব অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তদন্তে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো যাচাই প্রতিবেদনে তার ব্যবহৃত সনদের তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের দাবি করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সম্পর্কেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, তদন্তে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি বড় করে দেখা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা প্রত্যেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম