ঘনঘন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: নিরাপত্তাহীন নগরজীবনের নীরব আতঙ্ক
আশিকুর রহমান মাহী:
বাংলাদেশের নগরজীবনে এখন এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও গ্যাস লাইনের লিকেজ, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কিংবা জমে থাকা গ্যাস থেকে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কয়েকদিন আলোচনা হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিছু আশ্বাস দেওয়া হয়—কিন্তু বাস্তবে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন ঘটে না। ফলাফল, সাধারণ মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বাসা-বাড়িতে বসবাস করছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল, গ্যাস ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
একটি পরিবার শুধু কয়েক মিনিটের বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, সম্পর্ক—সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দুর্ঘটনা কি কেবল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস? নাকি এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্নীতি এবং দায়িত্বহীনতার ফল? বাস্তবতা বলছে, আমাদের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে বহুদিন ধরেই ভয়াবহ অনিয়ম ও ঝুঁকি জমে আছে। পুরোনো পাইপলাইন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অবৈধ সংযোগ এবং নিম্নমানের যন্ত্রপাতি মিলিয়ে আবাসিক এলাকাগুলো যেন ধীরে ধীরে “ডেথ ট্র্যাপে” পরিণত হচ্ছে।
একসময় শহরের সীমিত কিছু এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার হলেও এখন দেশের বহু মানুষ রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ব্যবহার বেড়েছে, নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়েনি। বাজারে অসংখ্য মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে পুরোনো সিলিন্ডার রিফিল করে নতুনের মতো বাজারজাত করছে। সাধারণ মানুষ বাহ্যিকভাবে বুঝতেই পারে না কোন সিলিন্ডার নিরাপদ আর কোনটি মৃত্যুফাঁদ। ফলে সামান্য অসতর্কতা কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটিতেই মুহূর্তে ঘটে যাচ্ছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
শুধু সিলিন্ডার নয়, পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বহু এলাকায় বছরের পর বছর পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন করা হয়নি। কোথাও লিকেজ থাকলেও তা দ্রুত শনাক্ত ও মেরামতের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আবার অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় গ্যাসের গন্ধ পেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না। দায়িত্বহীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অধিকাংশ প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন হয় না। যারা দায়িত্বে অবহেলা করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির খুব কম। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। অথচ এটি কেবল দুর্ঘটনা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি অবহেলাজনিত হত্যার শামিল।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা অডিট করা জরুরি। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। আবাসিক এলাকায় নিয়মিত লিকেজ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলপিজি সিলিন্ডারের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মেয়াদোত্তীর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি ও রিফিলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, জনগণের মাঝে নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন নাগরিক নিরাপদে বাঁচতে পারে। প্রতিদিন গ্যাস বিস্ফোরণে মানুষের প্রাণহানি ঘটার পরও যদি কার্যকর পরিবর্তন না আসে, তবে সেটি শুধু ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতারও প্রতিচ্ছবি। ফতুল্লার পরিবারের মতো আর কোনো পরিবার যেন এভাবে নিশ্চিহ্ন না হয়—সেই দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। নিরাপদ গ্যাস ব্যবস্থাপনা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার দাবি।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










