জৈবসার উৎপাদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কেন? প্রশ্নে উদ্যোক্তারা

জৈবসার যেহেতু দেশীয় উদ্যোক্তাদের একটি কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেহেতু এর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সময়োপযোগী হওয়া উচিত।

জৈবসার উৎপাদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কেন? প্রশ্নে উদ্যোক্তারা
প্রতীকী ছবি

আতিকুল্লাহ আরেফিন রাসেল:

দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে জৈবসারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সরকারের বিভিন্ন নীতিতেও পরিবেশবান্ধব কৃষির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে জৈবসার উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদের একাংশের অভিযোগ, পরিবেশবান্ধব এই শিল্পের বিকাশে প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র ((Environmental Clearance Certificate) বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, জৈবসার এমন একটি পণ্য যা কৃষিজ বর্জ্য, গোবর, ভার্মি কম্পোস্ট, ফসলের অবশিষ্টাংশ, খাদ্য বর্জ্যসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে উৎপাদিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো পরিবেশ রক্ষা, মাটির জৈব গুণাগুণ বৃদ্ধি এবং রাসায়নিক দূষণ কমানো। এমন একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনের জন্য কেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পৃথক ছাড়পত্র প্রয়োজন হবে—সে প্রশ্নই এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

রাজশাহী, বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি জৈবসার কারখানা স্থাপনের জন্য প্রথমে ট্রেড লাইসেন্স, এরপর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিভিন্ন পরিদর্শন এবং কাগজপত্র যাচাইয়ের মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই জটিলতা মোকাবিলা করতে না পেরে উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ান।

একাধিক উদ্যোক্তার অভিযোগ, ক্ষুদ্র আকারের জৈবসার উৎপাদন ইউনিট এবং বৃহৎ শিল্প কারখানাকে প্রায় একই ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় বিবেচনা করা হয়। ফলে ঝুঁকির মাত্রা কম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে অনেকে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

তাদের দাবি, জৈবসার যেহেতু দেশীয় উদ্যোক্তাদের একটি কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেহেতু এর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সময়োপযোগী হওয়া উচিত। বর্তমানে যেভাবে কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণের অনুমোদন সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রদান করা হয়, জৈবসারের ক্ষেত্রেও সেই ধরনের একটি পৃথক ও সহজতর ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। এতে যেমন উদ্যোক্তারা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন, তেমনি কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন জৈবসার পাবেন।

তবে পরিবেশবিদ ও নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বলছেন, জৈবসার পরিবেশবান্ধব হলেও এর উৎপাদন প্রক্রিয়া সবসময় ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত জৈব বর্জ্য, প্রাণীর মলমূত্র বা অন্যান্য জৈব উপাদান সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে দুর্গন্ধ, জীবাণু বিস্তার, ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ, তরল বর্জ্য নিঃসরণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের উদ্দেশ্য কোনো শিল্পকে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং নিশ্চিত করা যে উৎপাদন কার্যক্রম স্থানীয় পরিবেশ, পানি, বায়ু এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিকল্পনাহীনভাবে স্থাপিত জৈবসার কারখানা থেকে আশপাশের বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে দুর্গন্ধ ও দূষণের অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই পরিবেশগত অনুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে উদ্যোক্তারা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় একই সঙ্গে একাধিক দপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ব্যবসা পরিচালনাকে জটিল করে তুলছে। তারা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি জৈবসার উৎপাদন ইউনিটের জন্য “ওয়ান-স্টপ সার্ভিস” বা একক সেবা ব্যবস্থার আওতায় অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে। যেখানে কৃষি, পরিবেশ ও শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় যাচাই এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই সম্পন্ন হবে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বাংলাদেশ যখন টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের কথা বলছে, তখন জৈবসার শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। দেশের বিপুল কৃষিজ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য একদিকে পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা হলে সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব। বৃহৎ শিল্প কারখানার জন্য কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন অব্যাহত রেখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি জৈবসার উৎপাদন ইউনিটের ক্ষেত্রে সরলীকৃত অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে দ্রুত লাইসেন্স প্রদান, ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করেছেন তারা।

প্রশ্ন এখন একটাই যে শিল্পের মূল লক্ষ্যই পরিবেশ রক্ষা, সেই শিল্পের বিকাশে নিয়ন্ত্রণ থাকবে নাকি সহায়তা? পরিবেশ সুরক্ষা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই সুরক্ষার নামে যদি পরিবেশবান্ধব শিল্পের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তাই জৈবসার শিল্পের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই সময় পরিবেশ রক্ষা ও উদ্যোক্তা বিকাশের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়