সাইবার আইনে বড় সংস্কার আসছে: গুজব, অপতথ্য ও এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে কঠোর শাস্তির প্রস্তুতি

২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মকে বাধ্য করার উদ্যোগ; জুয়া ও মাদকবিরোধী আইনেও বড় পরিবর্তনের আভাস

সাইবার আইনে বড় সংস্কার আসছে: গুজব, অপতথ্য ও এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে কঠোর শাস্তির প্রস্তুতি
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত বিস্তার যেমন তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, তেমনি গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইনে ব্যাপক সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আইনে গুজব, মানহানি, অপতথ্য এবং এআই-নির্ভর ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।

সোমবার জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খানের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার নতুন সংজ্ঞা

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগকে অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নানা ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্মানহানি ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, কোন বিষয়টি প্রকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়বে এবং কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বা মানহানি হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নতুনভাবে নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণেই সংশোধিত আইনে এসব বিষয়ে স্পষ্ট সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

‘সাইবার স্পেস’-এর নতুন সংজ্ঞা

সরকার বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, ব্লগ, ভার্চুয়াল কমিউনিটি এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘সাইবার স্পেস’-এর একটি আধুনিক ও বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে বিদ্যমান আইন অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নতুন আইন এমনভাবে সাজানো হবে যাতে উদীয়মান প্রযুক্তি ও নতুন ধরনের ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

এআই-নির্ভর অপপ্রচার নিয়ে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, কণ্ঠস্বর এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি অপমানজনক, বিভ্রান্তিকর এবং মানহানিকর কনটেন্ট সামাজিক স্থিতিশীলতা, ব্যক্তি মর্যাদা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই এ ধরনের কনটেন্ট তৈরিকারী ও প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হবে।

দ্রুত কনটেন্ট অপসারণে বাধ্যবাধকতা

বর্তমানে কোনো ক্ষতিকর বা আইনবিরোধী কনটেন্ট অপসারণের জন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনও কখনও কোনো সাড়াও পাওয়া যায় না।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে সরকার নতুন আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কনটেন্ট অপসারণ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ক্ষতিকর কনটেন্ট রিপোর্ট হওয়ার পর তা দ্রুত যাচাই-বাছাই ও অপসারণ নিশ্চিত করতে আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে বাড়তি ক্ষমতা

নতুন আইনের আওতায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সরকারের অনুমোদিত বিশেষায়িত সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকেও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-কে তথ্য অপসারণ, ব্লক করা, সংরক্ষণ কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য হস্তান্তরের বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার

হেলেন জেরিন খানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে মেটাসহ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অনুরোধের বিষয়ে অনেক সময় দ্রুত সাড়া দেয় না। বিদ্যমান আইনে তাদের ওপর কার্যকর বাধ্যবাধকতা না থাকায় এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পথে এগোচ্ছে।

জুয়া প্রতিরোধ আইনেও আসছে যুগোপযোগী পরিবর্তন

সাইবার আইন সংস্কারের পাশাপাশি দেশের পুরোনো জুয়া প্রতিরোধ আইন আধুনিকায়নের উদ্যোগের কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক আমলের আইন বর্তমান বাস্তবতায় অনেকাংশেই অকার্যকর। তাই নতুন আইনে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ভার্চুয়াল গেমিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধসমূহকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

চলতি সংসদ অধিবেশনেই নতুন আইন উত্থাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনও নতুনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন আইনে উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপন, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডগ স্কোয়াড গঠন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ার প্রত্যাশা

সরকারের মতে, সাইবার অপরাধ, গুজব, মাদক, অনলাইন জুয়া এবং অন্যান্য সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। নতুন আইন কার্যকর হলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত হবে এবং নাগরিকরা আরও নিরাপদ সাইবার পরিবেশ পাবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়