১১ মাসে রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড: ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ালো এনবিআর
প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি, তবু লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে ৮১ হাজার কোটি টাকা; জুন শেষে আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, আমদানি-রপ্তানির ওঠানামা, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে একই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের নজির।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। কারণ, প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখনও প্রায় ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে রাজস্ব আদায়ের গতি আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
রোববার প্রকাশিত এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
গত বছরের তুলনায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায়
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে।
ফলে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অভ্যন্তরীণ কর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, ভ্যাট ও আয়কর আদায়ে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ এই প্রবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রথম ১১ মাসে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা।
কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, অর্জনের হার দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকা, আমদানি কমে যাওয়া এবং কিছু বড় করদাতার বকেয়া আদায় না হওয়াও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাতভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনটি প্রধান অনুবিভাগের মধ্যে আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
প্রথম ১১ মাসে—
কাস্টমস অনুবিভাগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ।
ভ্যাট অনুবিভাগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ০৫ শতাংশ।
আয়কর অনুবিভাগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, উৎসে কর আদায়ের কার্যকারিতা এবং করদাতাদের ডিজিটাল সেবার আওতায় আনার ফলে আয়কর খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে।
জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। এর ফলে ২০ জুন পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এই অঙ্ক ইতোমধ্যে গত অর্থবছরের পুরো বছরের মোট রাজস্ব আদায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকাকে ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই আগের বছরের পূর্ণাঙ্গ আদায়ের রেকর্ড অতিক্রম করেছে এনবিআর।
এনবিআর কর্মকর্তারা আশা করছেন, জুন মাসের শেষ ১০ দিনে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
সে ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের মোট রাজস্ব আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড।
তবে এত বড় অর্জনের পরও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজস্ব সংগ্রহের গতি আরও বাড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যে আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস—এই তিনটি অনুবিভাগে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কর ফাঁকি শনাক্তকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট পরিচালনা, উৎসে কর ও ভ্যাট আদায়ের তদারকি বৃদ্ধি, বকেয়া আদায় এবং দীর্ঘদিনের কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা, ই-রিটার্ন দাখিল, অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক নজরদারি কার্যক্রমও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি থাকলেও রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সরকারের আর্থিক সক্ষমতার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে অভ্যন্তরীণ রাজস্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তাদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং অপ্রদর্শিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে আগামী বছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ে আরও বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ে নতুন ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এনবিআর, অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের ব্যবধান কমিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে সমানভাবে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










