বাংলাদেশ যখন মুজিববর্ষ পালন করছে তখন তারা ‘পাকিস্তান দিবস’ পালন করছে
এইচ. আর মুহাম্মদ রাফি
বাংলাদেশ যেভাবে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছিল সম্ভবতঃ সেটি উপমহাদেশের মধ্যে বিস্ময়কর একটি যুদ্ধ। এটু গভীরভাবে দেখলে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির ছলচাতুরি এবং কুমতলব ধরা পড়ে। পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলাকে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯০৫ সালে ভাগ করার চেষ্টা করে বিলেতী সাহেবরা। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি ছিল এবং পূর্ববঙ্গের অধিকাংশরাই মুসলমান ছিল। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে এই বিভাজন বেশিদিন টিকে থাকেনি এবং ১৯১১ সালে তা আপত্তির মুখে বাতিল হয়ে যায়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করবার জন্য শোরগোল করছিলেন, তখন বিলেতীরা অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা প্রায় দিয়েই ফেলেছিলেন। উপমহাদেশে জিন্নাহর তত্বটি ‘দ্বি-জাতি তত্ব’ নামে পরিচিত। এই সময় জিন্নাহ সফল হন। দু’টি সম্পূর্ণ স্বাধীন জাতির সৃষ্টি হয় ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে হিন্দু-প্রধান স্থানগুলো নিয়ে ভারত সৃষ্টি হয় এবং মুসলিম-প্রধান স্থানগুলো নিয়ে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের দু’টো অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান আর, পশ্চিম পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান ভৌগলিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল। শুধু দূরত্বের দিক দিয়ে এই অংশদু’টো পৃথক ছিল এমনটি নয় ভাষার দিক দিয়েও এবং সংস্কৃতিতেও এদের মধ্যে পার্থক্য ছিল। বাস্তবিকই শেষোক্ত দু’টো কারণই পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) অত্যাচারী পাকিস্তানের নখড় থেকে স্বাধীনতার দিকে ঠেলে দেয়।
ওপরের ঘটনাগুলোই যথেষ্ট সাক্ষ্য বহন করে যে ঢাকায় ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রচেষ্টাটি একটি রাষ্ট্রীয় কূটচাল যা ১৬ কোটি বাংলাদেশীর আবেগকে অসম্মান দেখানোর মতো কাজ। তারা এটি প্রচার করতে চেষ্টা করছে যে তাদের দিনটি (২৩ মার্চ) একটি উল্লেখযোগ্য দিন, যে দিনে ১৯৪০ সালে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কবল থেকে মুক্ত-স্বাধীন হবার সংকল্প করে। যাহোক, তারা ধর্মের নামে তুরুপ করার এই কাজটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে এ কারণে যে এতে করে বাংলাদেশের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না কারণ, দেশটির ভিত্তিমূল বিনির্মাণ হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ওপর। বিশেষ কোন দূতাবাসের এসব কাজ বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক বৈষম্য বাড়ানোর লক্ষ্যে করা হচ্ছে এবং পাশ্ববর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ব্যবধানের একটি প্রচেষ্টা যে দেশটি আমাদের স্বাধীনতার সময় অকুণ্ঠ সমর্থন যুগিয়েছে এবং যার সহযোগিতা আমাদের স্বাধীনতা সময়ের পাথেয়। দুঃখ প্রকাশ না করে বরং তারা তাদের ২৩ মার্চের কর্মসূচি এই মুজিববর্ষে পালন করছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসটি ১৯৪৮ সাল থেকে খুঁজতে গেলেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রসঙ্গ এসে যায় যিনি ঢাকায় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে উর্দুই হবে সমগ্র পাকিস্তানের (পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের) দাপ্তরিক ভাষা। আর তখনকার তার এ ঘোষণাটিই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের মাঝে ভয়াবহ ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পূর্ব পাকিস্তানের সংথ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা ছিল বলে তারা এর বিরোধীতা করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশ থেকে ভয়াবহ বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। বেশ কিছু ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রাণ হারান যখন তারা এ সময়ের ‘ভাষা আন্দোলন’-য়ে অংশগ্রহণ করেন এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আরোপিত উর্দ্দু ভাষাকে বাংলা ভাষা-ভাষী বাঙালির বুকে চাপিয়ে দেয়ার বিরোধীতা করেন। ‘ভাষা আন্দোলন’ গুরুত্ব পাবার সাথে সাথে ধর্মের গুরুত্ব পেছনে পড়ে যায়। এটি তখন পরিস্কার হয়ে যায় যে তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তানে ধর্ম কোনো জরুরি উপাদান ছিল না।
পরবর্তীতে ইউনেস্কোর কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এভাবে নিসন্দেহে ভাষা বিষয়টি স্বাধীন বাংলাদেশের পথ রচনা করে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানীরা তখনই গভীরভাবে বুঝতে সক্ষম হল যে তারা বাঙালি এবং বাঙালি সংস্কৃতি দিয়ে তারা লালিত। পূর্ব পাকিস্তানীরা তখন শিক্ষায় এবং সংস্কৃতিতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষা-দীক্ষার একটি অন্যতম পাদপীট হিসেবে পরিগণিত হত।
চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনা, ১৯৭০-১৯৭৫, ভলিউম ১ অনুসারে এবং পাকিস্তানের প্লানিং কমিশনের প্রদত্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র অবস্থানটি পশ্চিম পাকিস্তানের পেছনে ছিল। ১৯৫০/৫১-১৯৫৪/৫৫ বছরগুলোতে দেশের সমগ্র ব্যয়ের শতকরা ৪৬ ভাগ পূর্ব অংশে ব্যয় করা হত এবং বাকী অংশ পশ্চিম পাকিস্তাণ অভিমুখে হত। ১৯৫৫/৫৬-১৯৫৯/৬০ বছরগুলোতে পূর্ব প্রান্তে এই ব্যয় নেমে আসে শতকরা ৩২ ভাগে। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত গড়ে পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ৩২ ভাগ ব্যয় হত যদিও এ অঞ্চল জনসংখ্যাধিক্যে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি ছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দেশের ৭০ ভাগ রপ্তনী পূর্ব পাকিস্তান থেকে হয় অথচ সে জাতীয় রপ্তানী আয়ের মাত্র ২৫ ভাগ পায়। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ১১টি বস্ত্রে কারখানা ছিল যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র ছিল নয়টি। অথচ ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৫০টি বস্ত্র কারখানা গড়ে ওঠে অথচ পূর্বাংশে এই ফিগার থাকে মাত্র ২৬টিতে। ২.৬ বিলিয়ন ডলারের (১৯৭১ সালের বিনিময় হার অনুযায়ী) সম্পদ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে নেয়া হয়। এসব পরিসংখ্যান থেকে পরিস্কার দেখা যায় পাকিস্তান (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান) পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদের পাচার করছিল যার কারণেই স্বাধীনতার পথটি তৈরী হয়। অন্য আর একটি ভন্ডামী ছিল ‘ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধ’।
১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর দাদাগিরি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ছেড়ে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান মন্ত্রীত্বের পদটি দিতে রাজি হলেন না যদিও উভয় অংশেই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল।
প্রতি বছর ২৩ মার্চে ‘পাকিস্তান দিবস’ পালন করাটি শঠামীর আরো একটি নজির এ কারণে যে ‘অপারেশান সার্চলাইট’ নামে ১৯৭১ সালে মার্চের ২৫ ও ২৬ তারিখে যে বর্বরতা চালানো হয় তা দেশের পূর্ব অংশে চালানো হয় যেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা রাত ১১:৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে এবং ফার্মগেটে বাঙালির বিরুদ্ধে গণহত্যায় নেমে পড়ে যা একইসাথে পীলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও চালানো হয় এবং রাত ১:১৫ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারই কিছুক্ষণ আগে শেখ মুজিবুর রহমান দবাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গভীর রাতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিকে আক্রমণ চালায় এবং অসংখ্য শিক্ষক ও ছাত্রদের হত্যা করে।
২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস পালন কূটনৈতিক মিশনের একটি দূরভিসন্ধিমূলক একটা কাজ নিসন্দেহে। তা অবশ্যই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কুমতলবগুলোকে চুরমার করে দেবে যে দেশটি সমগ্র এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দিয়ে জ্বলজ্বল করছে একটি তথাকথিত শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে। বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বারা ২৫-২৬ মার্চের রাতে বেসামরিক জনগণের ওপর সৃষ্ট ক্ষত তারা হয়ত ভুলে গিয়ে থাকবে যা একটি নির্মম, নৃশংস গণহত্যা তাদের সহযোগি রাজাকার, আলবদর, আল-শামসদের সাহায্য নিয়ে তারা করেছিল। যারা অনেক বছর পরে পাওয়া দুর্মূল্যের এই ‘মুজিববর্ষ’ পালন করতে ব্যস্ত সেই ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে দুর্বল স্থানটিতে ঘা দিয়ে তারা তাদের নিজেদের পরিকল্পনায় অবনত। এ ক্রিয়াকলাপগুলো হতাশাব্যঞ্জক এবং তাদের গোপন কুইচ্ছাগুলো কার্যকরা করারই অপচেষ্টা।
সংক্ষেপে বলা যায়, একজন খুব সহজেই দেখতে পারেন, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ, পশ্চিম পাকিস্তানীদের তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) ওপর প্রাধান্য বিস্তারের ঘটনাবলিই স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণ ছিল, ধর্ম নয়। ২০২০-২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত যে ‘মুজিববর্ষ’ পালন করা হচ্ছে তা অবশ্যই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কুমতলবগুলোকে চুরমার করে দেবে যে দেশটি সমগ্র এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দিয়ে জ্বলজ্বল করছে একটি তথাকথিত শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে।


crimediarybd1








