ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি অসংখ্য শ্রদ্ধা
আনওয়ার এ খান
প্রায় ৫ দশক আগে ভারতের দৃঢ় সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ-ভারতের নৈপুন্যপূর্ণ সৈন্যবাহিনীর মদদে পাকিস্তান বাহিনীকে পরাস্ত করে বাংলাদেশ একটি বিশাল বিজয় অর্জন করে। এ বিজয় অর্জিত হয় উভয় দেশের সরকারের দ্বিধাহীন সমর্থনে এবং মস্কোর সামরিক ও কুটনৈতিক সহযোগিতায়। যদিও বিষয়টি খুব বেশি প্রকাশ হয়নি তবু রাশিয়ার পাওয়ার প্লে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাংলার মাটিতে আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে বেশ কাজ দিয়েছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যেবেলায় ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে সর্বভারতীয় বেতারে ভাষণ দেয়ার সময় বলেছিলেন, “আমাদের দেশ ও দেশবাসীকে মারাত্মক একটি বিপদের মুহূর্তে তাদের সাথে কথা বলছি।”
“কয়েক ঘণ্টা আগে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে পুরোপুরি একটি যুদ্ধ শুরু করেছে” গান্ধী পাকিস্তান বিমান বাহিনীর (পিএএফ) ছিঁচকে চোরের মত হামলার প্রসঙ্গ টেনে এ কথা বলেন। “পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটি অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অভন্তিপুর, উত্তরলাই, জোধপুর, আম্বালা এবং আগ্রা নিশানা করে। এসব স্থানে সম্ভাব্য আক্রমণ ভারতীয় জঙ্গি বিমানগুলোর পাকিস্তানে হামলা ঠেকাতে বলেই মনে হয়। সমগ্র ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হল।”
“আজ বাংলাদেশের সংগ্রামটি ভারতের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে এবং এটি আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, আমার সরকারও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এতে ভারতের ওপর একটি বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছে”, ইন্দিরা গান্ধী আরো বলেন, “বাস্তবতঃ ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধেই ছিল।”
এভাবে তাদের নির্বোধের মতো কাজটি ভারতকে একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পররাষ্ট্র্র সচিব হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে টেলিফোন লাইনে ছিলেন তখন। পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধটি খুব একটা জুৎসই ছিল না কারণ ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যূহ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভেতর বিমান বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা নসাৎ করে দিয়ে উপমহাদের আকাশ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে পাকিস্তানী পশ্চিম অঞ্চলের সেনাবাহিনীর হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের ও মুক্তিবাহিনীর চব্বিশ ঘণ্টা উপর্যুপরি হামলায় ভারতীয় বাহিনীর দ্বারা অচলবস্থার প্রান্তে এসে তারা দাঁড়ায়। এর পরও প্রেসিডেন্ট নিক্সন আস্ফালন করছিলেন এবং পাকিস্তানকে রক্ষা করবার আশা প্রকাশ করছিলেন। পাকিস্তান তার বন্ধু আমেরিকার সাথে একমত পোষণ করছিলেন। নিক্সন তার বিমানবহর বহনকারী রণতরীগুলোকে সাথে সাথে এগিয়ে যেতে বলে। কিসিঞ্জার
বলেছিলেন, “বিমানবাহী বণতরীগুলো যাচ্ছে। ৪টি জর্ডানে বিমান পাকিস্তানের দিকে আগেই চলে গেছে। আরো ২২টি আসছে। আমরা সৌদীদের সাথেও কথা বলেছি আর, তুরস্ক পাঁচটি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সুতরাং আমরা ওদিকে যাচ্ছি আর, সন্ধি-সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে এসব অব্যাহত থাকবে।”
নিক্সন তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি বলতে পারো, চীনারা যদি কিছু সৈন্য পাঠায় বা তাদের দিয়ে ভয় দেখায়, তাহলে কি এটা বেশ সহায়ক হবে না ?” কিসিঞ্জার স্বীকৃতিতে জবাব দিলেন। নিক্সন মুখ খুললেন, তাদের হয় ভীতি প্রদর্শন করতে কবে কিংবা তাদের যেতে হবে, মোটকথা এ দু’টোর একটা তাদের করতে হবে।
নিক্সন জানতে চাইলেন, “পাকিস্তানের কাছে ফ্রান্সের কিছু বিমান বিক্রির খবর কি ?” কিসিঞ্জার জানান, তারা এসব ব্যবস্থা করা শুরু করে দিয়েছে। নিক্সন অধৈর্য্য হয়ে বললেন, “এটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। চীনারা ভারতকে এখনো কোন ভীতি প্রদর্শন করেনি।”
সামরিক ভাষায়, বাংলাদেশী অকুতোভয় এবং দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিপাগল সাধারণ মানুষরা ১৯৭১ সালের সময়টাতে আধুনিক ভারতের কাছে একটি খুব ভালো সময় এনে দিয়েছিল। ভারতীয় পদাতিক, বিমান ও নৌ বাহিনীর দক্ষ পেশাদারিত্ব ম্যানেকশ-এর অকল্পনীয় নেতৃত্বে একটি কারিশমা এনে দিয়েছিল। সাথে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক লবিং, বিশেষকরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চৌকষ পরিশ্রম এই বিখ্যাত বিজয় এনে দেয়।
দুই সপ্তাহের ভূমি, বিমান ও সমুদ্র পথে ভয়াবহ যুদ্ধের পর প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানী সৈন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এতো বড় আত্মসমর্পণ এর আগে ইতিহাসে মাত্র ১৯৪৩ সালে জেনারেল পাউলু-র কাছেই কেবলমাত্র স্টালিনগ্রাদে হয়েছিল। যাহোক, এতো বড় কাজটি ভিটো শক্তির অধিকারী মস্কোর সাহায্য ছাড়াই সম্পন্ন হয় যেখানে ১৯৭১ সালে একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরও ভারতের দূরদৃষ্টির ভেতর ছিল।
যাহোক, এখানে রাশিয়ার প্রভাবটি ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাঁড়াশি আন্দোলন যা ভারতকে বিপদগ্রস্ত করতে পারত, সেই সংকটগুলোকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। এমনকি ১০ ডিসেম্বরে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মুখে একধরণের বিদ্রুপাত্মক হাসি ফুটে ওঠে যখন ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের একটি বার্তা বাধা দেয় যে এ অঞ্চলের যুদ্ধ এলাকার ভেতর মার্কিন সপ্তম নৌবহর প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
এ সময় ৭৫ হাজার টন পরমাণু শক্তিসমৃদ্ধ বিমানবহরবাহী সপ্তম নৌবহর, ইউএসএস এন্টারপ্রাইস টনকিন উপসাগরে ছিল। এটি বিশের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ যা ৭০টি বোমারু বিমান ও যুদ্ধ বিমান বহন করতে সক্ষম। সপ্তম নৌবহর গাইডেড মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস কিং, গাইডেড মিসাইল ক্রুজার এইএসএস ডেকাতুর, পার্সসন্স ও টার্টার শ্যাম এবং বিশাল একটি উভচর হামলাকারী বিশাল একটি জাহাজ ইউএসএস ত্রিপলী সজ্জিত ছিল।
ভারতীয় শহরগুলো ও মার্কিন জাহাজের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল ২০ হাজার টন উড়োজাহাজবাহী ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহর ভিক্রান্ত। যখন জিজ্ঞাসা করা হল, পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহর সপ্তম নৌবহরের দায়িত্ব গ্রহণ করবে কী না তখন ফ্লাগ অফিসারের দায়িত্ব থাকা প্রধান সেনাপতি ভাইস অ্যাডমিরাল এন. কৃষ্ণান জবাব দেন, “আমাদের শুধু আদেশ দিন”। ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের বিমান বাহিনীকে সপ্তাখানের আগে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, তাদের জানিয়ে দেয়া হল, ইউএসএস এন্টারপ্রাইস থেকে সম্ভাব্য যে কোন ধরণের বিমান অনুপ্রবেশের জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
এর মধ্যে সোভিয়েট গোয়েন্দা বিভাগ থেকে জানানো হল, বিলেতী নৌবাহিনীর বিমানবাহী ঈগল জাহাজ ভারতীয় জলসীমার কাছাকাছি আসছে। সম্ভবতঃ এ সময়টি ছিল বর্তমান সভ্য বিশ্বের দু’টো গণতান্ত্রিক দেশের অন্য আর একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রতি ভয়াবহ সংকটাপন্ন সময় যখন সে দেশটি জার্মানীর ভয়াবহ হলোকাস্ট নাৎসী হত্যাযজ্ঞের পর চলতি বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যাকারীদের রক্ষা করবার জন্য এগিয়ে আসছিল। যাহোক, ভারত ভয় পেল না। সে গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নকে গোপন একটি শর্ত পাঠালো যে, ভারত তার আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আক্রান্ত হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন অবশ্যই বাহিঃশক্তির হামলা থেকে ভারতকে রক্ষায় এগিয়ে আসে।
বিলেতী ও মার্কিনীরা একটি সাঁড়াসী আক্রমণ চালাবে বলে ভারতকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। এ সময় বিলেতী রণতরী আরব সাগরে অবস্তান নিয়ে ভারতীয় পশ্চিম উপকুলের দিকে তাক করে ছিল। অন্যদিকে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পুব দিক হতে বঙ্গোপসাগরের দিকে ধেয়ে আসছিল যেখানে সাগর আর অগ্রসরমান ভারতীয় সৌন্যবাহিনীর মধ্যে প্রায় এক লাখ পাকিস্তানী সৈন্য আটকা পড়েছিল।
রাশিয়া ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকভ, দশম অপারেটিভ যোদ্ধাদলের নেতৃত্ব দানকারী (প্যাসেফিক রণতরী) অ্যাডমিরালের অধীনে ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত ফ্লোটিলা ভøাডিভস্টক থেকে পাঠায়। যদিও রাশিয়ার নৌবহরে যথেষ্ট সংখ্যক পরমাণু-সজ্জিত জাহাজ ও পরমাণু-চালিত সাবমেরিন ছিল কিন্তু সেখানে সীমিত পাল্লার মিসাইল ছিল যার দূরপাল্লা ছিল ৩০০ কিলোমিটার। এ কারণে একটি যুৎসই অবস্থানের জন্য রাশিয়ার নৌবাহিনীকে দারুণ বিলেতী ও মার্কিনীদের জাহাজগুলো ঘিরে রাখার বেষ্টনী তৈরী করতে ঝুঁকি নিতে হয়েছিল যেন তারা লক্ষ্যসীমার ভেতরই থাকে। এটি তারা সামরিক নিভুল দক্ষতায় করেছিল।
অবসরে যাওয়ার পর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অ্যাডমিরাল ক্রুগলিয়াকভ তার স্মৃতিকথায় বলেন, মস্কো রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজগুলোকে আদেশ দিয়েছিল যে ভারতীয় সামরিক লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি যেন ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরগুলো পৌঁছুতে না পারে তার জন্য বাধা দেয়া।
বন্ধু ক্রুগলিয়াকভ এ সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, প্রধান সেনাপতির আদেশ ছিল, যখন মার্কিনীরা আসবে তখন আমাদের সাবমেরিনগুলো অবশ্যই ভেসে উঠবে। এ প্রদর্শনটি করা হয়েছিল এ কারণে যে ভারত মহাসাগরে আমাদের পরমাণুসজ্জিত সাবমেরিন রয়েছে।
সুতরাং যখন সাবমেরিনগুলো ভেসে উঠল তখন তারা আমাদের চিনতে পারল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনারা দেখতে পেল জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইলসহ সোভিয়েত ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার, আণবিক শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিনগুলো তাদের পথরোধ করে আছে। আমরা তাদের ঘিরে রেখেছিলাম এবং আমাদের মিসাইলগুলো এন্টারপ্রাইসের দিকে তাক করানো ছিল। আমরা তাদের এমনভাবে গতিরোধ করে ফেলি যেন তারা করাচী, চট্টগ্রাম ও ঢাকার কাছাকাছি আসতে না পারে।
আমরা একটি বার্তা ধরতে পারি যাতে বিলেতী সেনাপতি অ্যাডমিরাল ডিমন গর্ডন বিলাতের যুদ্ধজাহারবহর থেকে সপ্তম নৌবহরের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “মহাশয়, আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। এখানে রাশিয়ার অনেক আণবিক ডুবোজাহাজ ও যুদ্ধজাহাজের বহর দেখছি।”
তখন বিলেতী যুদ্ধজাহাজ মাদাগাস্কারের দিকে পালিয়ে গেল আর মার্কিন টাস্ক ফোর্স বঙ্গোপসাগওে প্রবেশ করা থেকে থেমে যায়।
রাশিয়ার এ চালে ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সম্মিলিত একটি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানো গেল। নূতন প্রকাশিত বিশ্বাসযোগ্য নথি থেকে জানা যায় যে ভারতকে থামাতে যুক্তরাষ্ট্র সে সময় তিন ব্যাটেলিয়ান নৌসেনা তৈরি করে রাখার পরও ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে থাকে। আরো প্রকাশ, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজবাহী ইউএসএস এন্টারপ্রাইস ভারতীয় সৈন্যদের নিশানা করেছিল এবং ভেঙে পড়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লাহোরের প্রবেশপথের সড়ক বজ্রপাত ঘটাচ্ছিল।
হেনরী কিসিঞ্জারের আস্ফালন ও পাকিস্তানীদের সাহায্যের ডাক সত্বেও চীনারা কিছুই করেনি। ইন্দরা গান্ধী জানতেন যে চীনের হস্তক্ষেপের সম্ভবনায় রাশিয়ার উপস্থিতি একটি গ্রাহ্য বিষয় ছিল। একটি তারবার্তা যা ডিসেম্বরের ১০ তারিখে মন্ত্রীসভায় উত্থাপন করা হয়, তাতে বলা হয়, “যদি চীনারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, ইন্দিরা গান্ধী বলেন, চীনারা জানে যে একটি ডুবন্ত অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়ন কাজ করবে। সোভিয়েত বিমান বাহিনী তখন ভারতের আকাশ রক্ষায় উপস্থিত থাকবে।”
১৪ ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রধান এ এ কে নিয়াজী ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কনসাল-প্রধানকে জানান, তিনি আত্মসমর্পণ করতে চান। এ বার্তাটি আমেরিকায় পাঠানো হয় কিন্তু তা ওয়াশিংটন থেকে দিল্লীতে পৌঁছাতে ১৯ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। কাগজপত্র থেকে অনুমিত হয় যে, এই সময়টুকুতে ওয়াশিংটন ভারতের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নেবার কথা চিন্তা করছিল। কিসিঞ্জার এ সময়ের সংকটকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জার্মানীকে হিটলার সামরিক শক্তিতে বলীয়ান করতে যেমন “আমাদের রাইনল্যান্ড” হিসেবে ডাক দিয়েছিল, ঠিক সেরকম “আমাদের রাইনল্যান্ড” বলে ডাক দিতে যাচ্ছিলেন। এই শক্তিশালী ডাক থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে কিসিঞ্জার ও নিক্সন ভারতকে কেমন ভীতিকর অবস্থান থেকে দেখেছিল। নিক্সন ও কিসিঞ্জার সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভকে দূরালাপনিতে জিজ্ঞেস করেন যে ভারত কি নিশ্চেয়তা দিচ্ছে যে সে পশ্চিম পাকিস্তানকে আক্রমণ করবে না ! লেখক অধ্যাপক ভ্লাদিভ এম. যুবক তার এ ফেইল্ড এমপায়ার বইতে উল্লেখ করেছেন যে, নিক্সন বিষয়টি নিয়ে প্রায় তৈরী হয়েই ছিলেন যে, মস্কোর এ বিষয়ে কী দায় থাকবে তা আলোচনা করতে শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা।
কেন হোয়াইট হাউস পাকিস্তানকে সমর্থন যুগিয়ে গিয়েছে এর কোন কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন খুঁজে পায়নি। তারা বিশ্বাস করেছিল, পাকিস্তানই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। প্রথমে তিনি অবাক হয়েছিলেন আর তার পরই রেগে ফেটে পড়েছিলেন। তার ঘনিষ্ট মহল বলেন, তিনি ভারতকে আনবিক বোমা বানানোর কৌশল প্রায় দিতেই গিয়েছিলেন। তার পরামর্শকরা তাকে এ ইচ্ছেটি বাস্তবায়ন না করতে যথেষ্ট চেষ্টা করেন। এর কয়েক বছর পর, ব্রেজনেভ এ বিষয়টি চিন্তায় আনলে রেগে যেতেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরনে থু থু ছিটাতেন। সেদিনের ঘটনাবলি যারা লক্ষ্য করেছিলেন তাদের মধ্যে আজ যারা বেঁচে আছেন তাদের কাছে ১৯৭১ সালের এ দিনগুলো আকর্ষণীয় ঝলকানি বলে মনে হয়েছিল।
১৯৭১ সালে ভারত আত্মরক্ষার সামরিক ব্যূহের প্রাধান্য বজায় রাখতে সমর্থ্য হয়েছিল (ইউএসএ-ব্রিটেন-ফ্রান্স.... পাকিস্তানের পক্ষে চীনের মৌন সমর্থনের সগযোগিতায়....) কারণ, প্রথমতঃ এটি ছিল ভারতের ‘নৈতিক শক্তি’ এবং নিসন্দেহে দ্বিতীয়তঃ সে জানত যে সে যুদ্ধে বিজয়ী হতে যাচ্ছে তার ‘লক্ষ্যবস্তু’তে (পূর্ব ফ্রন্ট) যেটিই ছিল ১৯৭১ সালের কারণ ও যৌক্তিকতা।
পূর্ব ফ্রন্টে জনগণের গণযুদ্ধ বাংলাদেশ যৌথ মুক্তিযোদ্ধারা যে করেছে তা এনে দিয়েছে একটি বিজয় যা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল এবং এটি ‘দেয়ালের একটি লিখন’ তাদের জন্য যারা আগেই দেখতে পেয়েছিলেন।
এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধটি কারণ এবং সময়ে উভয়ের কাছে এক ছিল এবং একই সময়ে তার উদ্ভব হয়েছিল। হয়ত রিচার্ড নিক্সন বা হেনরী কিসিঞ্জারের মতো বোকা লোকেরা ফলাফল সম্পর্কে ভিন্ন আশা পোষণ করতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধটি সেরা যুদ্ধ। ভারতীয় সৈন্য বাদেও প্রায় অর্ধ-মিলিয়ন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধকে বিদ্রোহী বাঙালি সেনা।
বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্, (ইপিআর-এর সব সদস্য), বাঙালি পুলিশ (পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব পুলিশ) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ওপর, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জন্য দুর্ধর্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে এবং যুক্তরাজ্য একটু কমভাবে অংশগ্রহন করে একটু নোংরা খেলা খেলে। ঘৃণা বা ভালোবাসার সম্পর্ককে তোয়াক্কা না করে ভারতীয়রা এবং বাঙালিরা একসাথে বসবাস করবে এমনকি উপমহাদেশের যে কোন ঘটনাচক্রেও। তারা প্রাকৃতিকভাবেই পরস্পর ভাই। বাঙালিরা সব সময় বড় সহোদর ভাইয়ের মতো ভারতকে এবং প্রাক্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা বাঙালিদের দাবী আদায়ে তাদের পাশে দৃঢ়ভাবে ছিল। এভাবে নিক্সন-কিসিঞ্জারের গানবোট প্রাক্তন সোভিয়েটের কুটনীতিতে ডুবে যায়। আর, ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বরে আমেরিকা-পাকিস্তানের নোংরা কুরুচিকে গুড়িয়ে দেয়া হয়।
(লেখক : একজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক, দেশী ও বিদেশী দৃষ্টিকোন নিয়ে রাজনৈতিক ও মানবতাবোধের ওপর লেখক)
সূত্র- daily asian age
১১/৩/২০২০


crimediarybd1








