বাংলাদেশে আর কাউকে গুম হতে দিতে চাই না- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গুমবিরোধী আইন কার্যকর করার প্রত্যয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, ভুক্তভোগীদের আদালতে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিতের দাবি
আবু তাহের বাপ্পা, বিশেষ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক নিখোঁজ বা গুমের শিকার হতে দেখতে চান না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য এমন একটি আইন প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবার সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে।

আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি হোম মিনিস্টার। আমি নিজেই এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার। আমি চাইব না বাংলাদেশে আর কেউ গুম হোক।” তার মতে, শুধু একটি কমিশন গঠন করলেই গুমের মতো অপরাধের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি আইনি কাঠামো, যার মাধ্যমে ভুক্তভোগী বিচার পাওয়ার কার্যকর পথ পাবেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
গুমের ঘটনা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে আইনের আওতায় আনতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন আইনে গুমের ধরন, সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি, তদন্তের দায়িত্ব এবং ভুক্তভোগীর অধিকার নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গুমের শিকার কোনো ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় খুঁজে না পাওয়া গেলে তার পরিবারের সম্পত্তিগত অধিকার যাতে অনিশ্চিত না হয়, সে বিষয়টিও প্রস্তাবিত আইনি ব্যবস্থায় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে কারও মতামত বা আপত্তি থাকলে সংসদীয় কমিটিতে তা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আইন সংশোধনের পথ খোলা থাকবে বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।
গুমবিরোধী আইনকে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি আইনি সুরক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আজকের সরকার ভবিষ্যতে ক্ষমতায় নাও থাকতে পারে। কিন্তু আইনটি এমনভাবে কার্যকর থাকতে হবে, যাতে যে কোনো সময়, যে কোনো ব্যক্তি গুমের শিকার হলে তিনি বিচার পাওয়ার সুযোগ পান।
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গুমের অভিযোগে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির বিষয়টি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্যও প্রযোজ্য রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন মন্ত্রী
অনুষ্ঠানে নিজের গুমের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, ৬১ দিনের সেই সময় তার কাছে ছিল অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে ভরা। তখন প্রতিটি দিন পার হওয়া ছিল এক ধরনের অপেক্ষা—পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বোঝাতে চান, একজন মানুষকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ রাখার মানসিক অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে। তার মতে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাকে কোনোভাবেই তুচ্ছ করা বা উপহাসের বিষয় বানানো উচিত নয়।
গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় হাস্যরস বা অবমাননাকর মন্তব্যের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাকে খাটো করে দেখার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বেঁচে ফিরে আসা মানুষদের অভিজ্ঞতা নিয়ে হাসাহাসি করা শুধু তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদাকেই আঘাত করে না, ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তিনি বলেন, যারা গুমের শিকার হয়েছিলেন, তারা নিজেরাও জানতেন না শেষ পর্যন্ত তারা জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারবেন কি না। তাই তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র্যাবের প্রসঙ্গও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার বাহিনীটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করার পরিবর্তে জবাবদিহিমূলক সংস্কারের পথে এগিয়েছে।
তার মতে, আধুনিক সাইবার অপরাধ ও অন্যান্য জটিল অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত সক্ষমতার একটি বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সেই বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ও নৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও উঠে আসে। সংসদ সদস্য ও গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মূল দাবি তিনটি—সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি ও বিচার এবং সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ।
তিনি বলেন, নিখোঁজ স্বজনদের সঙ্গে কী ঘটেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য রাষ্ট্রকে দিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না রেখে দ্রুত কার্যকর করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনের কয়েকটি ধারা নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। বিশেষ করে আইনের ১৪, ১৯ ও ২১ ধারা বাতিলের দাবি তুলে স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার মতে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া গুমের অভিযোগের প্রকৃত সত্য বের করে আনা কঠিন হবে।
এ সময় দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা মিরাজ শেখের বিষয়েও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গে সাম্য, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের বিষয়গুলো গভীরভাবে যুক্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি দুর্বল হলে নাগরিকের অধিকারও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে আংশিকভাবে চর্চা করার সুযোগ নেই। বিরোধী মত ও ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে এবং একসময় তা কর্তৃত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গুমের অভিযোগের বিচার ও ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইনের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়—এর বাস্তব প্রয়োগ, স্বাধীন তদন্ত, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতাই শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটির সাফল্য নির্ধারণ করবে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাদের স্বজনদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেই সত্য জানা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কেউ যেন জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার শিকার না হন, সেই নিশ্চয়তাও তারা চান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিশ্রুতিই আবার সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, গুম প্রতিরোধ ও জবাবদিহির ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










