ফারাক্কার সব গেট খোলা, বাড়ছে পদ্মার পানি—চরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা

উজানে পানির চাপ, তিন দিনে রাজশাহী পয়েন্টে প্রায় দুই মিটার বৃদ্ধি; নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ

ফারাক্কার সব গেট খোলা, বাড়ছে পদ্মার পানি—চরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা
প্রতীকী ছবি

রাজশাহী প্রতিনিধি:

ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের ১০৯টি গেট খুলে দেওয়ার পর উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পানি গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ পদ্মার চর ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহীর বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ চর, কৃষিজমি ও বসতিপূর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত তিন দিনে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রায় দুই মিটার বেড়েছে। শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৭ দশমিক ২৬ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানানো হয়েছে। সেখানে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিপৎসীমার কাছাকাছি না গেলেও অল্প সময়ে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রাজশাহীর মাঝচর, আষাড়িয়াদহ, খিদিপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু জায়গায় ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব এলাকায় অনেক মানুষ কৃষিকাজ, মাছ ধরা, নৌযান চলাচলসহ নদীনির্ভর বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ পানি বাড়তে থাকায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষি ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নদীর পানি আরও বাড়লে চরাঞ্চলের বসতবাড়ি ও আবাদি জমিতে পানি ঢোকার ঝুঁকি বাড়বে। বিশেষ করে নিচু জমিতে থাকা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশু ও মানুষের নিরাপদ অবস্থান নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন স্থানীয়রা। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানিয়েছেন, নদীর পানির পরিস্থিতি এবং পূর্বাভাসের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানি কত দ্রুত বাড়ছে, কোন কোন এলাকায় এর প্রভাব পড়ছে এবং পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে—এসব বিষয় নজরদারির মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশও পদ্মায় পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছেন। ১০ সেপ্টেম্বর দেওয়া তার এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তিনি জানান, পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং এর ফলে চর ও নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর ফারাক্কা এলাকায় গঙ্গার পানির উচ্চতা ২৩ দশমিক ৭৫ মিটারে পৌঁছেছিল। সেখানে স্থানীয় বিপৎসীমা ২২ দশমিক ২৫ মিটার বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, ওই সময় পানির উচ্চতা নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল।

একই সঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজের ১০৯টি গেট খোলা থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা দিয়ে মোট পানিপ্রবাহ প্রায় ১৬ লাখ কিউসেকের কাছাকাছি ছিল এবং এর একটি অংশ ফিডার খাল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে পানির প্রবাহ, নদীর পানি বৃদ্ধির হার এবং বন্যার সম্ভাবনা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সর্বশেষ পরিমাপ ও পূর্বাভাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা দিয়ে উজানের অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়ার প্রভাব ভাটিতে বাংলাদেশের পদ্মায় পড়তে পারে। বিশেষ করে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যারাজের গেট খোলা থাকলে নিম্নাঞ্চলে পানির চাপ দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন তুলনামূলক দ্রুত ঘটতে পারে।

কারণ এসব এলাকার অনেক বসতি ও কৃষিজমি নদীর মূল প্রবাহের কাছাকাছি এবং অপেক্ষাকৃত নিচু ভূমিতে অবস্থিত। পানি বাড়লে প্রথমে চরাঞ্চলের নিচু জমি, ফসলের মাঠ ও নদীর কাছের চলাচলের পথগুলো আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরপর পানির উচ্চতা আরও বাড়লে বসতভিটা ও স্থানীয় সড়ক যোগাযোগে প্রভাব পড়তে পারে। নদীভাঙনের আশঙ্কাও এ সময়ে নতুন করে সামনে আসে।

পানির স্রোত বৃদ্ধি পেলে নদীর তীরের দুর্বল অংশে ভাঙন দেখা দিতে পারে। এর ফলে একদিকে প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়, অন্যদিকে নদীতীরবর্তী বসতিগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীভাঙনের পরিস্থিতিও নজরদারিতে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পানির উচ্চতা বৃদ্ধির খবর মানেই শুধু বন্যার আশঙ্কা নয়, এর সঙ্গে জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

অনেক পরিবার কৃষিজমি, গবাদিপশু ও নৌযানের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ পানি বেড়ে গেলে তারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ সব সময় পান না। ফলে আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই বেশি জরুরি। চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিয়মিত পানি পরিস্থিতির খবর রাখা, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে রাখা, গবাদিপশুর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর পরিস্থিতিও নজরে রাখা দরকার।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস এবং নদীর পানি পরিমাপের তথ্য সমন্বয় করে আগাম সতর্কতা জোরদার করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর পানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু একটি সময়ের পানির উচ্চতা দেখে পরিস্থিতির চূড়ান্ত পূর্বাভাস দেওয়া ঠিক নয়। পানি কত দ্রুত বাড়ছে, উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কেমন, পরবর্তী কয়েক দিনে নদীর প্রবাহ কী হতে পারে এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়।

তাই পদ্মার বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ এবং নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে ফারাক্কার উজানে পানির চাপ এবং ব্যারাজের গেট খোলার বিষয়টি বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকার জন্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। যদিও বর্তমানে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে অল্প সময়ে পানির উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে আগামী কয়েক দিনে পানি বৃদ্ধির গতি কেমন থাকে, সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নজর প্রয়োজন পদ্মার চর, নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী বসতিগুলোতে।

পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে আগেভাগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সতর্ক করা এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের আবাদি জমি ও ফসলের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শ দিতে হবে। নদী ও বন্যা বাংলাদেশের বাস্তবতার অংশ হলেও আধুনিক পূর্বাভাস, সময়মতো সতর্কতা এবং সমন্বিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

তাই ফারাক্কা থেকে পানির প্রবাহ এবং পদ্মার পানি বৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক নজরদারি ও আগাম প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী এক থেকে দুই দিনে পদ্মার পানি কোন গতিতে বাড়ে এবং সেই সঙ্গে চর ও নিম্নাঞ্চলে এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদীতীরবর্তী মানুষ।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি/ জাতীয়