ইউরোপে চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার: ভিডিওবার্তায় নির্যাতনের অভিযোগ, চক্রের হোতা গ্রেপ্তার

Trafficking of women under the pretext of jobs in Europe: Allegations of abuse in video message; ringleader arrested.

ইউরোপে চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার: ভিডিওবার্তায় নির্যাতনের অভিযোগ, চক্রের হোতা গ্রেপ্তার
ছবি- দৈনিক ক্রাইম ডায়রি
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় এবং পরে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে পাচারের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি মানবপাচার চক্রের অন্যতম প্রধান সদস্য মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে সোমবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে এসআরবি।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, আরজু প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য দিয়েছেন। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে তিনি বিভিন্ন অনুমোদনহীন এজেন্সির নাম ব্যবহার করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এসআরবি জানিয়েছে, এই চক্রের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে বিপাকে পড়া কামরুন নাহার নামের এক নারী গত ১৬ জুলাই এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়।
তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরজু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসআরবি ও এনএসআইয়ের প্রাথমিক তথ্যে কামরুন নাহার, ফাতেমা, আনজুমান আরা, পারভেজ, ফিরোজ ও মেহেদী হাসানসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। তাদের সার্বিয়া ও বেলারুশ হয়ে ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোট প্রায় ৮৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি সরাসরি ইউরোপে পাঠানোর পরিবর্তে বিভিন্ন ধাপে ভুক্তভোগীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যেত।
প্রথমে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পর নেপাল অথবা শ্রীলঙ্কা হয়ে তাদের মিশর কিংবা লিবিয়ায় নেওয়া হতো বলে অভিযোগ। এরপর সেখান থেকে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।
এই প্রক্রিয়ায় বিদেশে গিয়ে অনেকেই চাকরি বা প্রতিশ্রুত সুযোগের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও বিপদের মধ্যে পড়ে যান বলে জানিয়েছে এসআরবি।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত তিনজন ভুক্তভোগী বিদেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে কয়েকজন এখনো বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশে নেওয়ার পর কয়েকজন নারীকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে বন্দি করে রাখা, মারধর এবং সিগারেটের ছ্যাঁকাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের কথাও এসেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কামরুন নাহার মিশরে এবং আনজুমান আরা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন। পরে তারা সহায়তার জন্য এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
মিশর থেকে পালিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়া কামরুন নাহার ও আনজুমান আক্তার ভিডিওবার্তার মাধ্যমে তাদের অবস্থার কথা স্বজনদের জানিয়েছিলেন বলে লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।
এসআরবির দাবি, মিশরে আরও কয়েকজন নারী আটকা পড়ে থাকতে পারেন। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আরজু রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তাদের মধ্যে অনেকে বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি বা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ না পেয়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। কেউ কেউ সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতেও সক্ষম হয়েছেন।
এসআরবি আরও জানিয়েছে, প্রায় ৩০০ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর সঙ্গে সংস্থাটি যোগাযোগ রাখছে। বিভিন্ন অভিযোগ, মামলা, ঘটনা এবং গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা—চক্রটির মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা বা মানবপাচারের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।
তবে এই সংখ্যা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরজু বিভিন্ন অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ এবং ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ নাম ব্যবহারের তথ্য তদন্তে এসেছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, নিবন্ধন ও বৈধতার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, চক্রটি বিশেষ করে বেকার যুবক এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের লক্ষ্য করত। তাদের সামনে ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন ও বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগের কথা তুলে ধরে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো।
এসআরবি জানিয়েছে, আরজু রহমানের একটি ব্যাংক হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এই অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং এর সঙ্গে মানবপাচারের অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল আর্থিক সেবা, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে চক্রটির আর্থিক কাঠামো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানবপাচার-সংক্রান্ত মামলায় মোট ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। গ্রেপ্তারের পর তাকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
এসআরবি জানিয়েছে, আরজুর সঙ্গে জড়িত সহযোগী এবং মানবপাচার চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
মানবপাচারের মতো অপরাধে চাকরির প্রলোভনে বিদেশ যাওয়ার আগে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসার সত্যতা, নিয়োগকর্তার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অনুমোদন যাচাই না করে বড় অঙ্কের অর্থ না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তাও আবার সামনে এসেছে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম