১০ উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা:বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের মধ্যে অর্থের জোগান কোথা থেকে?
Discussions on purchasing 10 aircraft: Where will the funds come from amidst the electricity and gas crisis?
মো: ওমর ফারুক:
দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে বহর সম্প্রসারণের বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন করে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এবার ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকেও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত এই বহরে থাকবে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিমানকে দীর্ঘমেয়াদে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই মিশ্র বহরের এয়ারলাইনসে পরিণত করার লক্ষ্যেই বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এয়ারবাস কেনার আলোচনার সঙ্গে কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, বিমানের ভবিষ্যৎ রুট, যাত্রী চাহিদা, উড়োজাহাজের আসনসংখ্যা, উড্ডয়নসীমা এবং সম্ভাব্য ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বিবেচনা করেই বহরের ধরন নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোন রুটে কী ধরনের উড়োজাহাজ প্রয়োজন, সেই বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতেই বহর সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এয়ারবাস নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সম্প্রতি বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য সম্পূরক চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির আওতায় পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স কেনার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছিল বিমান। সেই চুক্তিতে অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই সুযোগ ব্যবহার করেই আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে দুই দফার চুক্তি মিলিয়ে বিমানের জন্য মোট ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, ১৩টি বোয়িং ৭৮৭-১০ এবং ১০টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। সংখ্যার হিসাবে ১৫টি হবে ওয়াইড-বডি এবং ১০টি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজও আগের চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্যেই কেনা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, বোয়িংয়ের কাছ থেকে প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরে পাওয়ার কথা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাকি উড়োজাহাজ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে দেশের বিমান পরিবহন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের জন্য বোয়িংকে অনুরোধ করেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
বিমানের পরিকল্পনায় ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজগুলোকে মূলত বেশি যাত্রী চাহিদাসম্পন্ন এবং দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটের পাশাপাশি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো দীর্ঘপাল্লার গন্তব্যেও এসব উড়োজাহাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজগুলো আঞ্চলিক ও অপেক্ষাকৃত স্বল্পপাল্লার রুটে ব্যবহার করা হবে। এতে বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান রুটেও ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজে সীমিত বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে বহরের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেশের যাত্রী পরিবহনে বিমানের অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করা।
এ ক্ষেত্রে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণের মডেলকে উদাহরণ হিসেবে দেখছে সরকার। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস দীর্ঘ সময়ে একটি তুলনামূলক ছোট ঐতিহ্যবাহী এয়ারলাইনস থেকে ১৬৭টি উড়োজাহাজের বড় বহরে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিমানবন্দরগুলোর যাত্রী চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশের নিজস্ব এয়ারলাইনসের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট যাত্রী চাহিদার ২০ শতাংশের কিছু বেশি বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বহন করছে। বিপরীতে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করছে বিভিন্ন বিদেশি এয়ারলাইনস।
এই পরিস্থিতিতে বিমানের বহর বাড়ানো হলে দেশের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান পরিবহন বাজারে বিমানের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য নতুন রুট চালু এবং চাহিদাসম্পন্ন রুটে ফ্লাইট বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।
তবে বড় বহর পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়; পাইলট, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, প্রশিক্ষণ এবং রুটভিত্তিক বাণিজ্যিক পরিকল্পনার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত উড়োজাহাজ কেনার অর্থায়নে বিমানের নিজস্ব আয় এবং উপযুক্ত অর্থায়ন কাঠামো ব্যবহার করা হবে। একসঙ্গে পুরো বহর হাতে না এসে ধাপে ধাপে উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হবে। ফলে অর্থ পরিশোধও পর্যায়ক্রমে করার সুযোগ থাকবে।
তার দাবি, বিমানের আর্থিক সক্ষমতা, বিভিন্ন রুট থেকে সম্ভাব্য আয় এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়েই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ কারণে সরকারি বাজেটের ওপর সরাসরি বড় ধরনের চাপ পড়বে না বলে তিনি মনে করেন।
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা বাস্তব চুক্তিতে রূপ নিলে বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসও বিমানের ভবিষ্যৎ বহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজের চলমান ক্রয় পরিকল্পনার সঙ্গে এটি যুক্ত হলে আগামী বছরগুলোতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর ও রুট পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দেশের আকাশপথে সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে একটি বড় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার একের পর এক নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। এর পর এবার এয়ারবাসের কাছ থেকেও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, অক্টোবরেই এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে।
বিষয়টি নিছক একটি এয়ারলাইনসের বহর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন, পরিচালন ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারের প্রশ্ন। একই সময়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নানা ধরনের সরবরাহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বিমানের বহর সম্প্রসারণের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের উৎস কী হবে এবং সেই অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা?
গত এপ্রিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। চুক্তিটির মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে প্রকাশিত হয়েছে। পরে আরও ১১টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত হওয়ায় মোট বোয়িং উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।
এর সঙ্গে প্রস্তাবিত ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা দাঁড়ায় ৩৫টিতে। প্রস্তাবিত এয়ারবাস বহরে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও থাকার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সব উড়োজাহাজ একসঙ্গে দেশে আসবে না। সরবরাহ কয়েক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে হওয়ার কথা। একইভাবে অর্থ পরিশোধও ধাপে ধাপে করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি থাকলেও দায়টি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসকেই বহন করতে হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সাম্প্রতিক সময়ে মুনাফা করেছে—এটি বহর সম্প্রসারণের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু উড়োজাহাজ কেনার সক্ষমতা নির্ধারণে শুধু একটি অর্থবছরের নিট মুনাফা যথেষ্ট নয়।
এখানে দেখতে হবে বিমানের প্রকৃত নগদ প্রবাহ কত, ঋণ বা অর্থায়নের সুদের হার কত, ডাউন পেমেন্ট কত, বছরে কিস্তি কত হবে এবং নতুন উড়োজাহাজগুলো থেকে প্রত্যাশিত আয় কতটা বাস্তবসম্মত।
একটি উড়োজাহাজ কেনার পর তার ক্রয়মূল্যের বাইরে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা, পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড অপারেশন এবং বিমানবন্দর-সংক্রান্ত ব্যয়ও বহন করতে হয়। ফলে ক্রয়মূল্যকে কেন্দ্র করে পুরো প্রকল্পের আর্থিক ভার বিচার করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিও উপেক্ষা করার মতো নয়। চলতি বছর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে ফিরলেও চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীর এলএনজি সরবরাহ আবার কমে যায় এবং মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা কম ব্যাকআপ নিয়ে পরিচালিত হওয়ার খবরও এসেছে।
অর্থাৎ দেশের শিল্পকারখানা যখন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন একই সময়ে রাষ্ট্রীয় খাতের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ ক্রয় পরিকল্পনা সামনে আসায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্ন উঠবেই।
তবে বিষয়টির অন্য দিকও আছে। দেশের বিমানযাত্রীদের একটি বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইনস ব্যবহার করে। পর্যাপ্ত নিজস্ব বহর না থাকায় আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি ক্যারিয়ারগুলোর হাতে চলে যায়।
সরকারের যুক্তি হচ্ছে, বিমানের বহর বাড়ানো গেলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট বৃদ্ধি এবং দেশের যাত্রী পরিবহনে বিমানের অংশ বাড়ানো সম্ভব হবে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক এয়ারলাইনসকে দেওয়া যাত্রী আয়ের একটি অংশ দেশীয় ক্যারিয়ারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা ও অন্যান্য বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক সংযোগও বাড়তে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু ‘উড়োজাহাজ কেনা হবে কি হবে না’—এভাবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, কোন সময়ে প্রয়োজন এবং প্রতিটি উড়োজাহাজ থেকে কী পরিমাণ বাণিজ্যিক আয় প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি নিয়ে এরই মধ্যে চুক্তির মূল্য, শর্ত, ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক যৌক্তিকতার বিস্তারিত প্রকাশের দাবি উঠেছে।
এ অবস্থায় এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন চুক্তি করার আগে সরকারের উচিত হতে পারে প্রকল্পটির পূর্ণ আর্থিক চিত্র জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। কত টাকা নগদ দিতে হবে, কত টাকা ঋণ নিতে হবে, সুদের হার কত, কিস্তি কত বছর চলবে, বিমানের প্রত্যাশিত আয় কত এবং সম্ভাব্য লোকসানের ঝুঁকি কী—এসব তথ্য স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পাইলট, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, হ্যাঙ্গার, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক রুটের বাণিজ্যিক সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে উড়োজাহাজ কেনার অর্থ সরাসরি জ্বালানি খাতে ব্যয় করা যাবে—এমন সরল সমীকরণও করা যাবে না। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিজস্ব বাণিজ্যিক আয় এবং আলাদা অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা থাকলে সেটি সরাসরি বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বাজেটের বিকল্প নয়।
তবে জাতীয় অর্থনীতিতে সম্পদের ব্যবহার সীমাহীন নয়। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং অন্যান্য জরুরি অবকাঠামোগত চাহিদা—সবকিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়।
সুতরাং বিমানের বহর সম্প্রসারণের প্রশ্নে মূল বিষয় হওয়া উচিত বিনিয়োগের অর্থনৈতিক রিটার্ন ও ঝুঁকি।
বিমান যদি নতুন উড়োজাহাজগুলো পর্যাপ্ত সময় আকাশে রাখতে পারে, লাভজনক আন্তর্জাতিক রুট বাড়াতে পারে এবং বিদেশি ক্যারিয়ারগুলোর কাছ থেকে দেশের বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে বড় বহর ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধির উৎস হতে পারে।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত রুট, যাত্রী বা পরিচালন সক্ষমতা ছাড়া অতিরিক্ত উড়োজাহাজ বহরে যোগ হলে ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ও বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
তাই এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে শুধু উড়োজাহাজের দাম নয়—সম্পূর্ণ জীবনচক্র ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয়, সম্ভাব্য আয়, রুটভিত্তিক যাত্রী চাহিদা, বৈদেশিক মুদ্রার দায় এবং worst-case পরিস্থিতিতে কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা প্রকাশ করা হলে জনমনে থাকা প্রশ্নগুলোর অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন—এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-গ্যাসের মতো মৌলিক অর্থনৈতিক অবকাঠামোর সংকটও বাস্তব। তাই বর্তমান সময়ে বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ ক্রয় পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—এটি দেশের ওপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করবে, নাকি ভবিষ্যতে নিজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হবে।
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য feasibility study, cash-flow projection এবং অর্থায়ন পরিকল্পনাতেই থাকা উচিত।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










