সৌদি আরবে সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন, প্রাণ গেল ১৭ বাংলাদেশির

আত্রাইয়ের ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, মরদেহ দেশে ফেরাতে সরকারি উদ্যোগের দাবি

সৌদি আরবে সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন, প্রাণ গেল ১৭ বাংলাদেশির
ছবি- দৈনিক ক্রাইম ডায়রি

আলাউদ্দিন সোহেল, নিজস্ব প্রতিনিধি:

সৌদি আরবে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জীবিকার তাগিদে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পাড়ি জমানো এসব প্রবাসী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে চলছে আহাজারি। বিশেষ করে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার একাধিক পরিবারের ঘরে নেমে এসেছে শোকের মাতম।

প্রাথমিকভাবে নিহত ১৭ বাংলাদেশির মধ্যে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার কথা জানা গেছে। শনাক্তদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার সাতজনের বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্য নিহতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়াও চলছে।

সৌদি আরবে কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ডকে নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে কিংবা স্বজনদের জন্য একটু ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এসব শ্রমিক। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু কর্মস্থলের আগুন মুহূর্তেই কেড়ে নিল তাদের জীবন।

সোফা তৈরির কারখানায় বিভিন্ন ধরনের দাহ্য উপকরণ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না এবং কর্মীদের জরুরি সময়ে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা।

সৌদি আরবের ওই অগ্নিকাণ্ডের খবর পৌঁছানোর পর নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নেমে এসেছে শোকের আবহ। একই উপজেলার একাধিক পরিবারের স্বজন নিহত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে গভীর শোক।

প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারগুলোর অনেকেই তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি এসব পরিবারকে এখন ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

স্থানীয়ভাবে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনেরা তাদের শেষবারের মতো দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য দ্রুত সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এই প্রাণহানি ঘটায় নিহতদের পরিবারের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, বেতন-ভাতা, বিমা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিধি এবং নিয়োগকর্তার দায়—সবকিছু যাচাই করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন আইনানুগ পাওনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো অনেক সময় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় ক্ষতিপূরণ আদায়ে সমস্যায় পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস ও শ্রমকল্যাণ উইংকে সমন্বিতভাবে বিষয়টি তদারক করার দাবি জানানো হয়েছে।

নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা রয়েছে। শোকাহত পরিবারগুলোর ওপর যেন মরদেহ দেশে আনার আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ না পড়ে, সে জন্য সরকারি খরচে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মরদেহ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করা, সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা এবং দেশে পৌঁছানোর পর নিজ নিজ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর—পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত। দেশের অর্থনীতিতে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এই দুর্ঘটনা প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের আগে শ্রমিকদের কর্মস্থল, নিয়োগকর্তা, আবাসন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে কারখানা, নির্মাণকাজ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

সৌদি আরবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানানো হয়েছে গভীর সমবেদনা।

নিহতদের পরিবার যেন এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোক সহ্য করার শক্তি পায়—এই প্রার্থনা সবার। মহান আল্লাহ নিহতদের সব গুনাহ মাফ করে তাদের জান্নাত নসিব করুন।

তবে শোক প্রকাশের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। যথাযথ ক্ষতিপূরণ, সরকারি সহায়তা এবং দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অন্তত এই কঠিন সময়ে পরিবারগুলো কিছুটা হলেও রাষ্ট্রীয় সহায়তার আশ্বাস পাবে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// সোহেল-রিয়াদ সৌদিআরব