কৃষি প্রকল্পে পিডি বদলের তৎপরতা: ১১ প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক

এর মধ্যে এমন কর্মকর্তার নামও আলোচনায় এসেছে, যাঁদের অতীতে প্রশাসনিক বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।

কৃষি প্রকল্পে পিডি বদলের তৎপরতা: ১১ প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

আতিকুল্লাহ আরেফিন রাসেলঃ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, পরিচালকদের কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত মূল্যায়নের আগেই একযোগে ১১টি প্রকল্পে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও মতভেদ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। জানা গেছে, আকস্মিক এক অনলাইন সভার মাধ্যমে কয়েকটি প্রকল্পের বর্তমান পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তাদের নাম আলোচনায় আসে।

তবে কেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের সরানো প্রয়োজন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে কি না, প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক কি না এবং প্রস্তাবিত কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা কতটা—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এর মধ্যে এমন কর্মকর্তার নামও আলোচনায় এসেছে, যাঁদের অতীতে প্রশাসনিক বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।

ফলে প্রকল্প পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কতটা যথাযথ হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, পিডি পদকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র ও জাতীয় দৈনিকের নিউজের বরাতে জানা যায় , পছন্দের কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক পদে বসাতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থের দর-কষাকষি হয়েছে এবং কারও কারও কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি; ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একটি পদায়নের অনিয়ম নয়, বরং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, বাস্তবায়ন এবং কাঙ্ক্ষিত কৃষি উন্নয়নের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

কারণ একজন প্রকল্প পরিচালকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিপুল সরকারি অর্থ, টেন্ডার, ক্রয়, জনবল ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন সরাসরি যুক্ত থাকে।

তাই পিডি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুপারিশ বা প্রভাব নয়, প্রকল্পের প্রয়োজন, কর্মকর্তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকৃতি—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।

এদিকে রাজনৈতিক ও পেশাজীবী বিভিন্ন মহল থেকে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে তদবিরের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি প্রকল্পের পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদি বাহ্যিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি কতটা বজায় থাকবে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু কর্মকর্তাদের বদলি নয়, পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিই পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে কে বা কারা পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলেন, কী ভিত্তিতে বর্তমান পরিচালকদের সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, প্রস্তাবিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং কোনো আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তার পেছনে বাস্তব কোনো প্রমাণ আছে কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাই করার কথা জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, একসঙ্গে এত প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের কারণ এবং পদায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্তই পর্যালোচনা করে, নাকি এর পেছনে থাকা সুপারিশ, যোগ্যতা যাচাই, প্রশাসনিক নথি এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনে।

কারণ কৃষি উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত সরকারি অর্থ ও প্রকল্পের সাফল্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের বিষয় নয়—এটি সরাসরি কৃষক ও রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে; তবে এতগুলো প্রকল্পের নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ যখন একই সময়ে সামনে এসেছে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে পরিষ্কার করা হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্যই তা হবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক।

এদিকে এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিএনপিপন্থী কৃষিবিদদের সংগঠন অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)-এর নাম আলোচনায় এলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১১ প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।

এ্যাবের সদস্যসচিব কৃষিবিদ শাহাদাত হোসেন বিপ্লব জানান, সম্প্রতি সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল ডিএইর মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছিল।

তবে ১১টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের যে প্রস্তাব বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে, সেটি প্রস্তুত বা পাঠানোর আগে এ্যাবের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো ধরনের পরামর্শ বা আলোচনা করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এ্যাবের এই নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তালিকায় এমন কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে, যাঁদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, একটি রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে—এমন অন্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হলে তাতে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

তাঁদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে অতীত ভূমিকা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতা সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

শাহাদাত হোসেন বিপ্লব আরও বলেন, কৃষি প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে প্রধান মানদণ্ড করা উচিত।

বিশেষ করে গত সরকারের সময়ে কোনো কর্মকর্তা কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কি না এবং তাঁর পেশাগত রেকর্ড কেমন—এসব বিষয় যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে এ্যাব।

তবে সংগঠনটির বক্তব্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা শুধু বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তনের দাবি নয়, বরং নতুন করে যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হবে তাঁদের নিয়েও যথাযথ যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থাৎ একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে অন্য একজনকে বসানোই যদি পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাতে প্রশাসনিক কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না বলে তাদের অবস্থান।

এ্যাবের পক্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পদায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন করতে হলে কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান এবং অতীত কর্মপরিধি মূল্যায়নের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

ফলে ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ এখন শুধু বদলি-পদায়নের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারা পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে, কী মানদণ্ডে নতুনদের নাম এসেছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে প্রকৃত যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে—এসব প্রশ্নও।

এ্যাবের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সংগঠনটির বক্তব্যে সেই প্রশ্নের একটি অংশের উত্তর মিললেও পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি এখনো স্পষ্ট নয়।

ফলে বিষয়টি নিয়ে কৃষি প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি // অনুসন্ধান // ক্রাইম 

সূত্রঃ নিজস্ব অনুসন্ধান, সোর্স, জাতীয় দৈনিক এর নিউজ