দোকানে বসে থাকা সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা, আগের হামলার যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ

​​​​​​​নেত্রকোনার দুর্গাপুরে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের হামলা; মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরে পাঁচটি গুলির আঘাত, হত্যাকারীদের ধরতে বিশেষ অভিযান

দোকানে বসে থাকা সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা, আগের হামলার যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজারে একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা গেছে। আগের হামলার সঙ্গে এবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। নিহত সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক চোরাচালান নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে তাঁর সাংবাদিকতা বা প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে উতরাইল বাজারের একটি দোকানে বসে ছিলেন আলিফ। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক সেখানে আসে। এরপর তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে তারা। আকস্মিক এ হামলায় বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গুলি চালানোর পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত সাংবাদিককে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে।

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। তিনি জানান, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে।

তবে হামলাকারীদের পরিচয়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং পালিয়ে যাওয়ার পর তারা কোন পথে গেছে—এসব বিষয়ে তদন্তের বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

প্রকাশ্যে একটি বাজারের দোকানে ঢুকে সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং হত্যার উদ্দেশ্য নির্ধারণ এখন তদন্তসংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিহত আলিফের ওপর এর আগেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা গেছে। গত ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র উঁচিয়ে ধাওয়া করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের হামলার ঘটনার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, ওই ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত চলছিল কি না এবং দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব তথ্য এখন বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। আগের হামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ বা মামলা থাকলে তার নথিও বর্তমান তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

তবে আগের হামলা এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আলিফ ফকির রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদক চোরাচালান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করতেন নিহত সাংবাদিক।

তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন, সাম্প্রতিক কোনো অনুসন্ধানী কাজ কিংবা এ-সংক্রান্ত হুমকি পাওয়ার তথ্য ছিল কি না, তা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে মাদক চোরাচালান নিয়ে লেখালেখির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করাও সমীচীন হবে না।

আলিফের পৈতৃক বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা এলাকায়। তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন বলে জানা গেছে।

একজন কর্মরত সাংবাদিকের ওপর আগের হামলার পর আবার প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং অপরাধের সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অপরাধ, মাদক চোরাচালান কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলকে ঘিরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

এ ধরনের ঘটনায় শুধু হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করাই নয়, হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য শনাক্ত করা, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী বা সহযোগীদের ভূমিকা থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা এবং আগের কোনো হুমকি বা হামলার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সেটিও তদন্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

আলিফ হত্যার ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন তাঁকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং আগের হামলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পুলিশের বিশেষ অভিযান ও তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন নজর স্থানীয় সাংবাদিক মহল ও এলাকাবাসীর। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হবে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম // সূত্র: পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রাপ্ত তথ্য