সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ মন্ত্রীর

শিশুদের সুস্থ বিকাশ ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিসা দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব; প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, উন্নত পরীক্ষাগার, দূষিত এলাকার পুনর্বাসন ও নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ

সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ মন্ত্রীর
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের অনুমোদিত জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কার্যকর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ।

মন্ত্রী বলেন, শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিসা দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য সরকার অনুমোদিত ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫’-এর বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা: সমাধানের সম্প্রসারণ ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে পিওর আর্থ বাংলাদেশ। এতে সহযোগিতা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫’ অনুমোদন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ কর্মপরিকল্পনায় সিসা দূষণের উৎস শনাক্ত করা থেকে শুরু করে পরিবেশগত নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন ও বিধিবিধান শক্তিশালী করা, শিল্প খাতের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, জনসচেতনতা, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় কৌশল অনুমোদনের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পরিকল্পনায় নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যক্রম সমন্বয় করা জরুরি।

একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আর্থিক সংস্থান ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তব কার্যক্রমে রূপান্তর করতে হবে বলে গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

সিসা দূষণ প্রতিরোধে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং পরিবেশে এর উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার বিষয়টি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং দূষণের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো শনাক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, দূষিত এলাকার পুনর্বাসন, নিরাপদ শিল্পব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দূষণের উৎস ও মাত্রা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু দূষণ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; দূষণের উৎস থেকে ঝুঁকি কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

সিসা দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শিশুদের বিকাশ এবং কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ কারণে সিসা দূষণ প্রতিরোধকে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের কর্মসূচি হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সেমিনারে মন্ত্রীর বক্তব্যে শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, দূষণের সম্ভাব্য উৎস পর্যবেক্ষণ করা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে সিসা দূষণের ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে।

জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে এ উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিক অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে সিসা দূষণ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে পরিকল্পনা অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন, তদারকি ও প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস। এ সময় পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, তরুণ প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী, সিসা দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর সমাধান সম্প্রসারণের পাশাপাশি তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তরুণদের সম্পৃক্ততা সহায়ক হতে পারে।

সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় কৌশলকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প খাতে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, দূষিত এলাকার পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত নজরদারির কার্যক্রম কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপর পরিকল্পনার অগ্রগতি নির্ভর করবে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।

সরকার অনুমোদিত ২০২৬–২০৩৫ মেয়াদের এই কর্মপরিকল্পনা সিসা দূষণ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের একটি কাঠামো তৈরি করেছে। এখন সেই কাঠামোর ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, নিয়মিত তদারকি এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিই সামনে এসেছে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়