স্বৈরাচারের দোসর আরশাদ ইমামের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ

জুলাই বিপ্লববিরোধী চক্রান্ত ও আভ্যন্তরীন অনিয়ম স্বত্বেও প্রশাসনিক পদে বহাল থাকা নিয়ে ক্ষোভ

স্বৈরাচারের দোসর আরশাদ ইমামের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি:
সাবেক সরকারঘনিষ্ঠ অতিরিক্ত সচিব ও বর্তমান কপিরাইট রেজিস্ট্রার এস এম আরশাদ ইমাম (পরিচিতি নম্বর-২০৩৪২)-এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাপ্তরিক শৃংখলা ভঙ্গসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে আরশাদ ইমাম প্রশাসনে দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল থাকায় তার অতীত ভূমিকা, আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে এবং কপিরাইট অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করতে তার ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও চক্রান্তের অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দ্রুত পদোন্নতির অভিযোগ
প্রশাসনিক সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ১৮তম ব্যাচের ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা এস এম আরশাদ ইমাম আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত হন।
২০২১-২০২২ সময়ে তিনি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (ইঅচঅজউ)-এর মহাপরিচালক হিসেবে যুগ্মসচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তাকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক পদে বদলি করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি প্রশাসনে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পোস্টে তার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে।


তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি রেকর্ডের মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া তিনি কপিরাইট অফিসের বিগত ২০২৫ অর্থ বছরে খরচের সাড়ে নয় লক্ষ টাকা উত্তোলন করে নিজের কাছে রেখেছেন। যা তিনি এখনো খরচ করেননি কিংবা এখনো অফিসিয়ালি কোন হিসাব প্রদান করেননি। তিনি কপিরাইট অফিসের সরকারী দুটি গাড়িই নিজের পারিবারিক কাজে ব্যবহার করেন। তিনি একটি গাড়ি নিজের স্ত্রীকে দিয়ে রেখেছেন যা তাকে তার অফিসে দিয়ে আসে এবং তিনি তা ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করেন। অন্য গাড়িটি তিনি নিজে ব্যবহার করেন এবং তার সন্তানকে স্কুলে নেয়া আনার কাজে ব্যবহার করা হয়।
তিন কোটি টাকার প্রকল্পে বিধিবহির্ভূত কার্যাদেশের অভিযোগ
আরশাদ ইমামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত “
ÒInvestment Component for Vulnerable Group Development (ICVGD), 2nd Phase, 1st Revised” প্রকল্পে তিনি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের Case Studz (GSB)’ খাতে প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই কার্যক্রম পরিচালনা না করার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা উপেক্ষা করে একটি বেসরকারি সংস্থাকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে তিনি
Women’s Environment and Development Organization (WEDO) এবং Notification of Award (NOA) কার্যাদেশ প্রদান করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
এ ঘটনায় তৎকালীন সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি তার কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—এ বিষয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—প্রকল্পের বরাদ্দ, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা, কার্যাদেশ প্রদানের এখতিয়ার এবং ঘঙঅ জারির আগে অনুসরণ করা প্রশাসনিক ও ক্রয়প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের কারণে বিষয়টি পরবর্তীতে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নথি বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
গোপালগঞ্জ একাডেমিতে জোড়া বেতন নেওয়ার অভিযোগ
গোপালগঞ্জের
BAPARD এ মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আরশাদ ইমামের বিরুদ্ধে সরকারি বেতন উত্তোলন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি একই মাসে দুইবার বেতন উত্তোলন করেছিলেন। পরবর্তীতে অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে তাগাদা দেওয়া হলেও তিনি তা ফেরত দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না, তা সরকারি নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ তহবিলের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
একই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি সংশ্লিষ্ট এক সহকারী পরিচালক (ট্রেনিং)-এর কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে ‘ধার’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তৈরি হয়।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রশিক্ষণ তহবিলের হিসাব, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং অডিট আপত্তি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ইমামদের নিয়ে মন্তব্য ও প্রত্যাহারের অভিযোগ
গোপালগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় মসজিদের ইমামদের নিয়ে আপত্তিকর বা অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ ও জনরোষ সৃষ্টি হলে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের সরকারি আদেশ, অভিযোগের লিখিত কপি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কপিরাইট অফিসের কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ
বর্তমানে কপিরাইট রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি কেনাকাটা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কপিরাইট অফিসে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া, বাজারদর যাচাই, চাহিদা নির্ধারণ এবং সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কোন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে, কীভাবে দর নির্ধারণ হয়েছে, ক্রয় কমিটির সুপারিশ কী ছিল এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু পণ্য বা সেবা পাওয়া গেছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত অডিট ও নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।  আগারগাঁও কপিরাইট ভবনের ফোরগুলির ভাড়ার টাকা তিনি নিজে উত্তোলন করে নিজের একাউন্টে টাকা গ্রহন করেন কিন্তু সেই টাকার কোন হিসাব এখনো প্রদান করেননি। অথচ ভাড়ার টাকা সরকারি কোষাগারে যাবার কথা।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিদেশি কর্ম অনুমোদনের অভিযোগ
কপিরাইট অফিসে বিদেশি কর্ম বা সৃজনশীল কাজ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু বিদেশি কর্মের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।


তাদের প্রশ্ন, কপিরাইট আইনের অধীনে কোনো কর্ম নিবন্ধন বা অনুমোদনের আগে প্রয়োজনীয় আইনগত ও কারিগরি যাচাই করা হয়েছিল কি না। বিশেষ করে বিদেশি কর্মের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, মালিকানা, উৎস, অনুমোদন এবং আইনগত অবস্থান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
আইন বিষয়ে ডিগ্রি না থাকা কর্মকর্তাকে পরীক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ
কপিরাইট অফিসের পরীক্ষক বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আইন বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডিগ্রি বা পেশাগত যোগ্যতা না থাকা একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে অপেক্ষাকৃত বেশি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে পরীক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কপিরাইট আইন, মেধাস্বত্ব এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয়ে কাজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির যোগ্যতা কী হওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা কী—তা যাচাই করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ব্যক্তিগত সুসম্পর্কে শৃংখলাভঙ্গকারীদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ
কপিরাইট অফিসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত বিলম্বে অফিসে উপস্থিত হওয়া, নথি নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব করা এবং দাপ্তরিক শৃংখলা লংঘনের পরও বারবার সুযোগ পেয়েছেন।


একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে নথি আটকে রাখলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার প্রশ্ন
আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ একজন ব্যক্তিকে কপিরাইট অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের তদন্ত বা অভিযোগ চলমান থাকলে সংবেদনশীল প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি ও তদন্তের অবস্থা কী ছিল, সেই বিষয়টিও পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
দুদকে তদন্ত চলাকালীন আইটি শাখার দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন
কপিরাইট অফিসের আইটি শাখা পরিচালনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দতা নেই—এমন একজনকে দিয়ে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ আইটি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।


সরকারি দপ্তরের আইটি শাখার সঙ্গে অনলাইন সেবা, ডাটাবেজ, ডিজিটাল নথি, সফটওয়্যার, সার্ভার ও তথ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারিগরি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে অবস্থানের অভিযোগ
অফিস সময়ের বাইরেও সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক দায়িত্ব বা জরুরি কাজের সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময়, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করা হয়। এতে বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, অফিস সহায়ক জনবলসহ সরকারি সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। তবে কোনো কর্মকর্তা দাপ্তরিক প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকলে সেটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজের অংশ হতে পারে। তাই অভিযোগটি যাচাইয়ের জন্য অফিস লগ, দায়িত্বের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের কাজের বিবরণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যোগ্য সহকারী রেজিস্ট্রারদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ
কপিরাইট অফিসের অভিজ্ঞ ও দক্ষ সহকারী রেজিস্ট্রারদের যথাযথ মর্যাদা না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দতা থাকা সত্ত্বেও কিছু সহকারী রেজিস্ট্রারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।

তাদের দায়িত্ব ও পদমর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত না করে অসম্মান ও অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কপিরাইটের মতো বিশেষায়িত দপ্তরে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো না হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থানের অভিযোগ
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়েও আরশাদ ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু পোস্ট ও বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি ওই আন্দোলনের বিরোধী অবস্থানে ছিলেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে তার অনুসারীদের মধ্যে মন্তব্য করেছেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তৎপর রয়েছেন। কপিরাইট অফিসের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতাকেও কেউ কেউ এ অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করছেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের সত্যতা, পোস্টদাতার পরিচয়, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের প্রধান পদে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ উঠলে বিষয়গুলো রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নথিভিত্তিক প্রশাসনিক তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, আরশাদ ইমামের দায়িত্ব পালনকালের সরকারি ক্রয়, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, ঘঙঅ ও কার্যাদেশ, বেতন উত্তোলনের হিসাব, প্রশিণ তহবিল, বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত নথি, কপিরাইট নিবন্ধন ও বিদেশি কর্ম অনুমোদনের ফাইল, পরীক্ষক নিয়োগ, অফিস উপস্থিতির রেকর্ড এবং আইটি শাখার দায়িত্ব বণ্টন, সরকারী অর্থ ও সম্পদ আত্বসাৎ, অপব্যবহার—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা হোক।

একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দুদক বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থায় কোনো তদন্ত, অনুসন্ধান কিংবা অভিযোগ চলমান থাকলে তার বর্তমান প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সেটির সামঞ্জস্যও পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীরা আরও বলছেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভিযোগের বিষয়ে কপিরাইট রেজিস্ট্রার এস এম আরশাদ ইমামের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য, লিখিত ব্যাখ্যা বা সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে। এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। 

আর অভিযোগগুলো অসত্য বা বিভ্রান্তিকর হলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও পরিষ্কার করা উচিত। সব মিলিয়ে কপিরাইট অফিসের বর্তমান প্রশাসনিক পরিবেশ, সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং রেজিস্ট্রার এস এম আরশাদ ইমামের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। 
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দৈনিক ক্রাইম ডায়রির বিশেষ প্রতিনিধি আবু তাহের বাপ্পা ও অন্য সময় সম্পাদক নিজে তার বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করলে তিনি কারো সাথেই কথা বলতে রাজী হননি। পরবর্তীতে সহকারী রেজিষ্ট্রারের সাথে কথা বলতে বলেন। সহকারী রেজিষ্টার দৈনিক ক্রাইম ডায়রিকে জানান, এগুলো তার ব্যক্তিগত বিষয় কেন্দ্রিক সুতরাং তিনি যথাযথ মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে এসব অভিযোগ তার কাছেও অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা করেছে বলে তিনি এক পর্যায়ে জানান। এবিষয়ে কপিরাইট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের অভিযোগ বিস্তর।

রেজিষ্ট্রারের কর্মকান্ডে তারা রীতিমতো ক্ষুদ্ধ। কর্মকর্তাদের  ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মুহুর্তে ধারনকৃত দুটি অডিও রেকর্ড দৈনিক ক্রাইম ডায়রির হাতে এসেছে। যেখানে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজিষ্টারের দূর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলেন।
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য কপিরাইট অফিস দেখেন এমন একজন দায়িত্বরত যুগ্ম সচিবের মোবাইল নম্বরে ০১৩০৪........৭২ নম্বরে কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীরেদ দাবী অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ৯,৩৪,০০০/- টাকা তুলে তিনি তার নিকট রেখেছেন সেই টাকার কোন হিসাব এখনো তিনি দপ্তরে দেননি এবং সকল কেনাকাটা তিনি একা করেন যা অস্বচ্ছতার শামিল। জানা গেছে বিগত রেজিষ্ট্রার কেনাকাটায় একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন যা তিনি বিলুপ্ত করেছেন।

এছাড়া কপিরাইট অফিসের ভাড়ার টাকা তিনি নিজ একাউন্টে উত্তোলন করেন যা সরকারী কোষাগারে যাবার কথা। সবগুলো বিষয়ই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী রাখে। প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজেই সব বিষয়ে স্বচ্ছতা পছন্দ করেন এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গ করাকে অপছন্দ করেন সেখানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক অনিয়মের ঊর্ধ্বে রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই এখন সময়ের দাবী।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি//ক্রাইম