লিটারে ২০ টাকা বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
আজ থেকে ডিজেল ১৩৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা; বিপিসির লোকসান সামলাতে বড় মূল্য সমন্বয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে দেশে আবারও বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের জ্বালানির দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে। নতুন মূল্য সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছিল। ফলে এক ঘোষণায় চার ধরনের জ্বালানির দামই ২০ টাকা করে বেড়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পুরো প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাজারে সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—বিপিসির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিপিসির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সংস্থাটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিপিসি ওই ক্ষতির অর্থ সরকারি ভর্তুকি বা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সমন্বয়ের উদ্যোগ চেয়েছে।
নতুন মূল্য সমন্বয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ডিজেলের ক্ষেত্রে বিপিসির বড় লোকসানের বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে দেশের বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান থাকায় ডিজেল বিক্রিতে বিপিসির প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল বলে হিসাব করা হয়েছে।
এই হিসাবে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে বিপিসির প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করা হয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নয়, বিপিসির নিজস্ব অর্থসংকটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর বিপিসির হাতে ব্যবহারযোগ্য কার্যকর মূলধন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও পরবর্তী মাসগুলোতে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
বিপিসি জ্বালানি আমদানি নির্বিঘ্ন রাখতে অন্তত দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ কার্যকর মূলধন ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে এ জন্য অতিরিক্ত ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চলতি বছর জ্বালানি তেলের দামে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। বছরের শুরুতে বিভিন্ন ধাপে দাম কমানোর পর এপ্রিলে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়।
১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রলের ১৯ টাকা এবং অকটেনের ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর জুনে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিন পর্যন্ত এই মূল্য বহাল ছিল।
এরপর ২০ সেপ্টেম্বর নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে চার ধরনের জ্বালানির দামই আরও ২০ টাকা করে বাড়ানো হলো। ফলে বছরের শুরুতে যে দামে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছিল, তার তুলনায় বর্তমানে ভোক্তাদের অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ডিজেল দেশের গণপরিবহন, পণ্যবাহী যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাস ও অন্যান্য ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব সরবরাহব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হলে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করতে পারেন।
ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পাম্পে তেল কেনার সময়েই সীমাবদ্ধ না থেকে বাজারের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডিজেল একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। সেচপাম্প, কৃষিযন্ত্র এবং ফসল পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সেচনির্ভর এলাকায় ডিজেলের বাড়তি মূল্য কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে মাঠ থেকে বাজার কিংবা বাজার থেকে আড়তে কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষের ওপরই পড়তে পারে।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ভাড়া, সেচের খরচ, পণ্য সরবরাহ এবং বাজারে ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের ওপর।
জ্বালানি তেলের দাম অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছাতে পরিবহন প্রয়োজন। ফলে পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় সাধারণত জ্বালানি মূল্যকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। তবে নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাজারে ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সরকারের বাজার তদারকির ওপর।
মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকার জ্বালানি মজুত বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে সরকার অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।
বিপিসির আর্থিক সংকটের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি অক্টোবর থেকে জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিয়ে চাপের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে এবং সরকারের কাছে দ্রুত অর্থ সহায়তার আবেদন করেছে।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর এখন দেশের জ্বালানি বাজারের জন্য আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে ভবিষ্যতে দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন কত দ্রুত এবং কীভাবে ঘটবে, সেটি নিয়েও ভোক্তাদের আগ্রহ রয়েছে।
বর্তমান সিদ্ধান্তে একদিকে বিপিসির লোকসান কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভোক্তাদের ওপর। ফলে সামনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা, বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
নতুন দামে আজ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি খাতে সরকারের আর্থিক চাপ কতটা কমে এবং এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কতটা প্রভাব পড়ে—এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










