প্রকৃতির আগাম বার্তা: গ্রিনহাউস এফেক্ট থেকে হিমালয়ের হিমবাহ ভয়াবহ ভবিষ্যতের মুখোমুখি মানবজাতি

প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেন একই বার্তা দিচ্ছে—পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতা।

প্রকৃতির আগাম বার্তা: গ্রিনহাউস এফেক্ট থেকে হিমালয়ের হিমবাহ ভয়াবহ ভবিষ্যতের মুখোমুখি মানবজাতি
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

আশিকুর রহমান মাহী:

হিমালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা হঠাৎ বন্যার স্রোত, গলতে থাকা বরফ, ভেঙে পড়া পাহাড়, নদীর উন্মত্ততা কিংবা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক অস্বাভাবিক আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেন একই বার্তা দিচ্ছে—পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতা।

নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে হঠাৎ বন্যা ও পাহাড়ধসের মতো ঘটনা সেই বৃহত্তর সংকটেরই একটি সতর্ক সংকেত। হিমালয়ের বরফ ও পাহাড়ের পরিবর্তন শুধু নেপাল বা তিব্বতের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে না; হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

প্রশ্ন হলো—প্রকৃতি কি প্রতিশোধ নিচ্ছে? নাকি মানুষ নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোও ক্রমে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হচ্ছে?

উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, গ্রিনহাউস গ্যাস, বন, পাহাড়, নদী, সমুদ্র এবং মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে। গ্রিনহাউস এফেক্ট নিজে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বরং এটি পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বায়ুমণ্ডলের কিছু গ্যাস সূর্যের তাপের একটি অংশ ধরে রাখে, ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা জীবনধারণের উপযোগী থাকে।

সমস্যা তৈরি হয়েছে যখন মানুষের কর্মকাণ্ডে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে গেছে। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো, শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, বন উজাড়, কৃষি ও পশুপালনসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। এর ফলে পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপ মহাশূন্যে বের হয়ে যেতে পারছে না। ধীরে ধীরে বাড়ছে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা।

এই অতিরিক্ত উষ্ণতার প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান। হিমালয়কে বলা হয় এশিয়ার পানির অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদী-ব্যবস্থার উৎস এই পর্বতমালা।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে হিমবাহের ওপর চাপ বাড়ছে। কোথাও বরফ দ্রুত গলছে, কোথাও হিমবাহের আয়তন কমছে, আবার কোথাও বরফ ও পাথরের কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে।

এর সবচেয়ে ভয়াবহ একটি ঝুঁকি হলো হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা, যা সাধারণভাবে নামে পরিচিত।

পাহাড়ের ওপর হিমবাহ গলে পানি জমে হ্রদ তৈরি হতে পারে। সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ি জনপদ, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা নদীর তীরবর্তী বসতিতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হতে পারে।

এ ধরনের বিপদে মানুষকে প্রস্তুতির সময়ও অনেক কম পাওয়া যায়। পাহাড়ধসকে আমরা অনেক সময় শুধু অতিবৃষ্টির ফল হিসেবে দেখি। বাস্তবে এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত পাহাড়ের মাটিতে পানির পরিমাণ বাড়ায়। এতে মাটির স্থিতিশীলতা কমতে পারে। তার সঙ্গে যদি বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, খনন, পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন কিংবা পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল পরিবর্তন করা হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি হয়তো বিপদ সৃষ্টি করছে, কিন্তু মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড অনেক সময় সেই বিপদকে দুর্যোগে পরিণত করছে।

উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে যখন বৃষ্টি হয়, তখন স্বল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটতে পারে। এর ফল হতে পারে আকস্মিক বন্যা। শহরাঞ্চলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল হলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে একই ধরনের অতিবৃষ্টি দ্রুত পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

আর নদীর উজানে অতিবৃষ্টি ও ভাটিতে দুর্বল অবকাঠামো—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় সতর্কতা হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি।

এর পেছনে দুটি বড় প্রক্রিয়া কাজ করছে—উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের পানির প্রসারণ এবং স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রে পানি যোগ হওয়া। বিশ্বের উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলগুলো এ কারণে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপভিত্তিক দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল, নদী মোহনা এবং নিচু ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীল।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে শুধু ভূমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়ে না; লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, নিরাপদ পানির সংকট এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধির মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

খাদ্য সংকটের আশঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পানি বা আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য উৎপাদনে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা, লবণাক্ততা এবং নতুন ধরনের রোগবালাই কৃষির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কৃষক কখন বীজ বপন করবেন, কখন ফসল কাটবেন—ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। কোনো কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত পানি, আবার অন্য অঞ্চলে পানির অভাব—এই বৈপরীত্য খাদ্যব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

পানির জন্য ভবিষ্যতের সংঘাত?

পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তন, অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—দুইয়ের প্রভাবে নদীর পানিপ্রবাহের ধরন বদলে যেতে পারে।

কোথাও অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি, আবার দীর্ঘ সময়ে পানির ঘাটতি—এমন পরিস্থিতি নদী অববাহিকার দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। হিমালয়ের পানি যেহেতু বহু দেশের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাই ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একটি বন ধ্বংস হলে আমরা শুধু গাছ হারাই না; হারাই মাটির একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। বনভূমি বৃষ্টির পানি শোষণ ও ধীরগতিতে প্রবাহিত হতে সহায়তা করে। ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে।

বন উজাড় হলে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা দুর্বল হয়ে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলে এর পরিণতি হতে পারে মাটিক্ষয়, পলিপ্রবাহ, নদীর তলদেশ ভরাট এবং বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি। তাই বন সংরক্ষণকে শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বড় একটি ক্ষেত্র হবে নগরজীবন।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দ্রুত সম্প্রসারিত শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ এবং অতিরিক্ত কংক্রিটের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ কমে যায়।

ফলে স্বল্পসময়ের ভারী বৃষ্টিও বড় ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে শহরের কংক্রিট ও পিচের পৃষ্ঠ তাপ ধরে রাখে। এতে নগরাঞ্চলে ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যতের শহরকে তাই শুধু উঁচু ভবন দিয়ে নয়—খাল, জলাধার, সবুজ এলাকা, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো দিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। দুর্যোগের আগাম বার্তা আসছে—কিন্তু আমরা কি শুনছি? প্রকৃতি দুর্যোগের আগে সবসময় ঘণ্টা বাজিয়ে সতর্ক করে না। তবে অনেক ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আগাম ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে।

হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, হিমবাহ-হ্রদের আয়তন বৃদ্ধি, পাহাড়ের ঢালে ফাটল, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, সমুদ্রের অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা উপকূলীয় লবণাক্ততার বিস্তার—এসবকে ঝুঁকির সূচক হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট, রাডার, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, নদীর পানি পরিমাপ কেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু সতর্কবার্তা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। সেই বার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং মানুষকে তা অনুসরণ করার সক্ষমতাও দিতে হবে।

ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় কী করতে হবে? মানবজাতির সামনে এখন মূল প্রশ্ন—কীভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়? প্রথমত, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন রক্ষা ও ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। চতুর্থত, নদী, খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে। পঞ্চমত, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।ষষ্ঠত, দুর্যোগের সময় মানুষ কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে এবং কোথায় আশ্রয় নেবে—তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।

সপ্তমত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়।

একজন নাগরিকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের ধরন, ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা, প্লাস্টিক ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাছ লাগানো এবং পানি ব্যবহারের অভ্যাসও সামগ্রিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরও বেশি। দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নিয়ম মেনে উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রকৃতিকে শুধু সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জীবনধারণের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টি শুধু বিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি নৈতিকতারও প্রশ্ন। ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম ও নৈতিক দর্শনে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা, অপচয় থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোরআনে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে—যাতে মানুষ নিজেদের কাজের পরিণতি উপলব্ধি করতে পারে। (সূরা আর-রূম, ৩০:৪১)

আবার পৃথিবীতে সংশোধনের পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার নির্দেশও রয়েছে। (সূরা আল-আরাফ, ৭:৫৬)

তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে ‘ঐশী শাস্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিক বা দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। দুর্যোগের কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞান প্রয়োজন। আর প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের নৈতিক শিক্ষা মানুষকে সেই বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। হিমালয়ের পাহাড়ে যে পরিবর্তন শুরু হয়, তার প্রতিধ্বনি অনেক সময় হাজার কিলোমিটার দূরের ভাটির দেশেও পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশের নদী, কৃষি, পানিসম্পদ ও পরিবেশের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলের জলপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। তাই উজানের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন—সবকিছুই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি—দুই ধরনের সংকটকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

বাংলাদেশকে তাই শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার দেশ হলে চলবে না; দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দেশ হতে হবে।

ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী বৈজ্ঞানিকভাবে দায়িত্বশীল নয়। কিন্তু এটিও সত্য যে জলবায়ু পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে অনেক ধরনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

কোথাও তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হবে, কোথাও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাবে। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা। কোথাও পাহাড়ধস, কোথাও সমুদ্রের আগ্রাসন। খাদ্য, পানি ও নিরাপদ বসবাসের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই, যারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কম সক্ষম। অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অভিবাসন, নগরায়ণ, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের সংকটও।

নেপালের পাহাড় থেকে নেমে আসা বন্যার স্রোত হয়তো একটি নির্দিষ্ট জনপদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার বার্তা আরও বিস্তৃত। হিমবাহ আমাদের সতর্ক করছে। নদী সতর্ক করছে। সমুদ্র সতর্ক করছে। অতিরিক্ত তাপ সতর্ক করছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টি সতর্ক করছে। পাহাড়ধস সতর্ক করছে। বন উজাড়ের পরিণতিও সতর্ক করছে। প্রশ্ন হলো—মানুষ সেই সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে?

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ কখনো স্থায়ীভাবে জিততে পারবে না। বরং টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো প্রকৃতির নিয়মকে বোঝা, বৈজ্ঞানিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। পৃথিবীকে বাঁচানোর কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পৃথিবী কেমন হবে, তার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে আজই।

হিমালয়ের বরফ যদি গলে যায়, পাহাড় যদি অস্থিতিশীল হয়, নদী যদি তার স্বাভাবিক পথ হারায়, বন যদি উজাড় হয়ে যায় এবং বায়ুমণ্ডল যদি আরও উত্তপ্ত হয়—তাহলে প্রকৃতির দেওয়া প্রতিটি সতর্কবার্তা একদিন আরও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

তাই এখন সময় আতঙ্কিত হওয়ার নয়—প্রস্তুত হওয়ার। সময় প্রকৃতিকে জয় করার নয়—প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের। সময় দুর্যোগের পরে শুধু ক্ষয়ক্ষতি গোনার নয়—দুর্যোগের আগেই জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করার। আর সবচেয়ে বড় কথা, পৃথিবীকে আমাদের সম্পত্তি নয়—পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে দেখার।

কারণ প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না। প্রকৃতি শুধু মানুষের কর্মকাণ্ডের পরিণতি ফিরিয়ে দেয়। আর সেই পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে আজ আমরা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তার ওপর।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়