গজারি বনের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর শঙ্কা : কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে দেড় বছরে অর্ধশত প্রাণহানির দাবি

২৮ কিলোমিটার সড়কে ২০টির মতো বিপজ্জনক বাঁক, নেই পর্যাপ্ত দৃশ্যমানতা—দ্রুতগতির যান, সড়কে মাটি ও ঝোপঝাড় বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

গজারি বনের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর শঙ্কা : কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে দেড় বছরে অর্ধশত প্রাণহানির দাবি
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

গাজীপুর প্রতিনিধি:

দুই পাশে বিস্তীর্ণ গজারি বন। কোথাও ঘন ঝোপঝাড়, কোথাও আবার গাছপালায় ঢাকা সরু বাঁক। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা একটি আঞ্চলিক সড়ক। সবুজের আবরণে ঢাকা থাকায় দূর থেকে পথটি যতটা মনোরম মনে হয়, বাস্তবে ততটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর-মাওনা সড়ক। বিশেষ করে সড়কের একের পর এক অপ্রশস্ত ও দৃষ্টিসীমাহীন বাঁক এখন চালক ও যাত্রীদের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ।

কালিয়াকৈর থেকে ফুলবাড়িয়া হয়ে শ্রীপুরের মাওনা পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কে নিয়মিতই ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দা, চালক ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক থেকে দেড় বছরে সড়কটিতে শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার দাবি করেছেন তারা। তবে দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ কয়েক দিন আগের একটি দুর্ঘটনা আবারও সড়কটির ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্র সামনে এনেছে। কালিয়াকৈর থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা মাওনা চৌরাস্তার দিকে যাচ্ছিল। পথে কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে অটোরিকশাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে চালকসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হন। পরে আহতদের মধ্যে মা-ছেলেসহ চারজনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় সড়কটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ আর এগোয় না। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যায় এবং পরবর্তী সময়ে আবারও ঘটে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ফুলবাড়িয়া হয়ে মাওনা পর্যন্ত সড়কটি আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মাওনা হয়ে ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের পথ হিসেবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এ সড়ক ব্যবহার করেন।

কিন্তু যানবাহনের চাপের তুলনায় সড়কটির প্রস্থ কম। কোথাও কোথাও সড়কটি আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ ফুট প্রশস্ত। ফলে দুটি বড় যানবাহন পাশাপাশি চলাচলের সময় পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। তার ওপর পুরো সড়কজুড়ে রয়েছে অসংখ্য বাঁক।

স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়কে ১৮ থেকে ২০টির মতো বাঁক রয়েছে, যেগুলোর বেশ কয়েকটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বাঁকের দুই পাশে ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড় থাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে আগেভাগে দেখা যায় না। ফলে বাঁকের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ সামনে যানবাহন চলে এলে চালকের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব কম থাকে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এমন পরিস্থিতিতে সড়কের বাঁক, যানবাহনের গতি, দৃশ্যমানতা এবং সড়কের প্রস্থ—সবকিছু একসঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। চালকের সামান্য ভুল বা অতিরিক্ত গতি তখন বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সড়কটির অনেক অংশ তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় চালকরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি গতিতে গাড়ি চালান। বিভিন্ন যানবাহন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে চলাচল করে বলে চালকদের অভিযোগ।

সমস্যা তৈরি হয় যখন এমন গতিতে চলতে থাকা গাড়ি হঠাৎ তীব্র বাঁকের মুখে পড়ে। সামনে রাস্তার অবস্থা বা বিপরীত দিকের গাড়ি আগে থেকে দেখা না গেলে চালককে অল্প সময়ের মধ্যেই গতি কমানো, ব্রেক করা কিংবা গাড়ির দিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তখন নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা বেড়ে যায়।

চালক আরিফুল ইসলাম বলেন, সড়কটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দৃষ্টিসীমা। গজারি বনের কারণে অনেক বাঁকে বিপরীত দিকের গাড়ি দেখা যায় না। ফলে হঠাৎ সামনে গাড়ি চলে এলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে আরও কার্যকর সতর্কতামূলক সংকেত এবং গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আরেক চালক মো. জনি হাসান বলেন, এ সড়কে যানবাহনের চাপ কম নয়। একই সঙ্গে বাঁকের সংখ্যাও বেশি। চালকরা যদি বাঁকের আগে থেকেই গতি কমিয়ে দেন, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক চিহ্ন ও চালকদের সচেতনতা।

সড়কে পড়ে থাকা মাটিও বাড়াচ্ছে বিপদ

শুধু বাঁক কিংবা সড়কের সংকীর্ণতাই নয়, বিভিন্ন সময় মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কের ওপর মাটি পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।

তাদের ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে সড়কে পড়ে থাকা মাটি ধুলাবালি তৈরি করে। আবার বৃষ্টির সময় সেই মাটি পানিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যায়। এতে বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিতভাবে সড়কের ওপর পড়ে থাকা মাটি পরিষ্কার করা এবং মাটিবাহী যানবাহনের চলাচলে যথাযথ নজরদারি থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।

এই সড়কে দুর্ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, সড়কের প্রকৃতি ও যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা দরকার।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গাজীপুর জেলা সভাপতি রাকিব হাসান বলেন, এ আঞ্চলিক সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করে বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর দাবি আগে থেকেই রয়েছে। এ বিষয়ে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য, সড়কটির দুর্ঘটনা শুধু চালকের অসতর্কতার বিষয় নয়; অবকাঠামোগত সমস্যাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের প্রস্থ, বাঁক, দৃশ্যমানতা এবং যানবাহনের গতি—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সড়কটির দুই পাশে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল থাকায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ের পর অনেক অংশই অপেক্ষাকৃত নির্জন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, দুর্ঘটনার পাশাপাশি এ ধরনের নির্জন এলাকায় যাত্রী ও চালকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

তাদের মতে, বনঘেরা দীর্ঘ সড়কে পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি থাকলে দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দ্রুত সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।

জয়দেবপুর সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারিক হোসেন বলেন, কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কটি তুলনামূলক সংকুচিত এবং এতে অতিরিক্ত বাঁক রয়েছে। সড়কটি সম্প্রসারণ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।

তিনি জানান, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সড়কটি সম্প্রসারণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন।

তবে সড়ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাস্তব জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কের বড় একটি অংশ বন বিভাগের গাছ ও জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সম্প্রসারণের কাজ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

অর্থাৎ শুধু সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্যোগে চাইলেই পুরো সড়ক দ্রুত প্রশস্ত করা সম্ভব নয়। বন বিভাগের জমি ও গাছের বিষয়টি নিষ্পত্তি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, সড়কটির ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সংস্কারের আশা করছেন তারা।

তিনি চালকদেরও সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানোর আহ্বান জানান। বিশেষ করে বাঁকের কাছে গতি কমানো এবং দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তবে শুধু চালকদের সতর্ক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ সড়কের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দৃষ্টিসীমার সমস্যা এবং বাঁকের নকশাগত ঝুঁকি দূর না হলে একই ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

স্থানীয়দের মতে, কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কের দুর্ঘটনা কমাতে একসঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোকে প্রকৌশলগতভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। যেখানে সম্ভব সেখানে বাঁক প্রশস্ত ও দৃশ্যমান করতে হবে। বন ও ঝোপঝাড়ের কারণে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিপজ্জনক বাঁকের আগে দূর থেকেই দেখা যায় এমন সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, প্রতিফলক, গতি সীমার নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় সড়কচিহ্ন স্থাপন করতে হবে। রাতের বেলায় দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিফলক ও আলোকব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সড়কের ওপর মাটি পড়ে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ এবং মাটিবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিবহন বিধি কার্যকর করা জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

চতুর্থত, সড়কটির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে প্রয়োজনীয় অংশ সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।

কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কের দুই পাশের গজারি বন এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। কিন্তু সেই বনই যখন সড়কের বাঁকে চালকের দৃষ্টিসীমা আটকে দেয়, তখন সৌন্দর্যের আড়ালে তৈরি হয় প্রাণঘাতী ঝুঁকি।

স্থানীয়দের দাবি করা অর্ধশতাধিক প্রাণহানির হিসাব সত্যতা যাচাইয়ের দাবি রাখে। তবে সাম্প্রতিক একের পর এক দুর্ঘটনা যে সড়কটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সড়কটি শুধু প্রশস্ত করাই নয়—কোন বাঁক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় দৃশ্যমানতা কম, কোথায় যানবাহনের গতি বেশি, কোথায় সড়কে মাটি জমে থাকে—এসব তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সরকারি পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হবে।

নইলে গজারি বনের সবুজে ঢাকা এই সড়ক দিনের বেলায় যতই শান্ত ও মনোরম দেখাক, অসতর্কতার একটি মুহূর্তে তার কোনো একটি বাঁকই আবারও কেড়ে নিতে পারে একটি পরিবারে প্রিয়জনকে। স্থানীয়দের ভাষায়, সেই কারণেই কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কের বাঁকগুলো এখন শুধু বাঁক নয়—অনেকের কাছে এগুলো সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদ।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// স্পেশাল-জেলা