কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান জোরদারের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বেনজীরকে দেশে ফেরাতে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান জোরদারের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

হাতিম বাদশা:

রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মোহাম্মদপুরকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং রাজধানীর যেসব এলাকায় অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে, সেসব স্থানে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হবে।

শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মোহাম্মদপুর বহু বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। সেখানে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের নানা অভিযোগ রয়েছে। সরকার এসব অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। খুব দ্রুতই সেখানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হবে।”

তিনি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। অপরাধী চক্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে পুলিশ বাহিনী কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তৎপরতা ও পেশাদারিত্ব সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতেই আজ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে সনদপত্র ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দক্ষতা ও সেবার মান বৃদ্ধি করতে এ ধরনের স্বীকৃতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হবে।

তিনি বলেন, “দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা আইনের আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সরকার ছাড় দিচ্ছে না। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।”

বর্তমান সরকারের কার্যক্রম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক গতিশীল বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।

তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং বিভিন্ন অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ জনগণের কাছে সরকারের কার্যকর অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে— এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জননিরাপত্তার প্রশ্নে সরকার কোনো ঝুঁকি নেবে না।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মাদক ও অস্ত্রবিরোধী কার্যক্রম এবং কিশোর গ্যাং দমনে পৃথক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুরকে কেন্দ্র করে অপরাধী নেটওয়ার্ক ভাঙার উদ্যোগও এর অংশ।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান নয়, অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।

সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর এখন দেখার বিষয়, রাজধানীর বহুল আলোচিত অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন কত দ্রুত বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি/ক্রাইম