সলিমপুরে খাসজমির রহস্য: সরকারি রেকর্ড থেকে উধাও প্রায় দুই লাখ শতক
রেকর্ডে গরমিল, জালিয়াতির অভিযোগে ভূমি ও রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা আলোচনায়; পাহাড় কেটে প্লট বিক্রির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার সম্পদ বেহাত।
মো: হোসেন মিন্টু, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি খাসজমি নিয়ে বিস্ময়কর অসঙ্গতির তথ্য সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের নথিতে যেখানে তিন লাখের বেশি শতক সরকারি জমির হিসাব রয়েছে, সেখানে স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের রেকর্ডে তার বড় একটি অংশের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র জাল কাগজপত্র, ভুয়া মালিকানা এবং প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ খাসজমি দখল, বিক্রি ও নামজারি করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার শতক জমি রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের নথিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সংরক্ষিত তথ্য ঘেঁটে পাওয়া যায় মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতকের রেকর্ড। ফলে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমির হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
ভূমি-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তি, ভূমিদস্যু ও অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এই জমি বেদখলের প্রক্রিয়া চলেছে। অভিযোগ রয়েছে, খাসজমির প্রকৃত তালিকা আড়াল করে ভুয়া মালিকানা সৃষ্টি করা হয়। এরপর দলিল নিবন্ধন ও নামজারির মাধ্যমে জমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি দখলের আগে পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়। পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলার পর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে টিলা ও পাহাড় কেটে মাটি সরানো হয়। পরবর্তীতে ওই এলাকাকে আবাসিক প্লট হিসেবে বাজারজাত করা হয়। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এতে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একসময় পাহাড় ও টিলায় ঘেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বড় অংশ এখন সমতল কিংবা গভীর খাদের রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাহাড় কেটে ফেলার ফলে ভূপ্রকৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়ে ভারী যান চলাচলের জন্য নির্মিত সড়ক নতুন ঝুঁকির জন্ম দিয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের জমির প্রকৃত অবস্থা, মালিকানা পরিবর্তনের ইতিহাস এবং রেকর্ডের অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে আলোচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখল বা মালিকানার ভিত্তিও যাচাই করা হবে।
এদিকে অতীতে একাধিকবার খাসজমি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাঙ্ক্ষিত সফলতা পায়নি। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থায়ী ফল বয়ে আনতে পারেনি।
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ জমির চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমানে রেকর্ডে যে পরিমাণ জমি পাওয়া যাচ্ছে, তা আবেদনকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ড জালিয়াতি এবং বেহাত হওয়া খাসজমির পরিমাণ নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত ছাড়া প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা না গেলে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ চিরতরে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জেলা










