অসংখ্য প্রতারণার মূল হোতা ইসহাক গ্রেফতার
গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে ইসহাকের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন এমন ৪০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম যেখা্ন হতে তিনি প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তালিকায় রয়েছে বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠান।
আপনি এই প্রতিষ্ঠানের মালিক। আমি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করবো। তখন আমি তাকে বলি মালিক কীভাবে হলাম। তখন ইসহাক বলে জয়েন্ট স্টকে আপনার নাম আছে। পরে জয়েন্টস্টকের কাগজপত্রে আমিসহ আরও ৭ জনের নাম দেখতে পাই। প্রত্যেকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে কাগজপত্র দিয়ে জয়েনস্টকে জমা দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ইসহাক ও তার সহযোগীরা প্রথমে শহরের ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বহুতল ভবনে বড় পরিসরে কখনো এনজিও, ভুয়া পত্রিকা অফিস, কখনো করপোরেট অফিস, কখনো থ্রি ও ফোর স্টার মানের হোটেলের নামে একাধিক ফ্লোর ভাড়া নেন। ইসহাক নিজেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের এমডি কিংবা চেয়ারম্যান, পরিচালক অথবা সিইও হিসাবে পরিচয় দেন। অফিস সাজানো-গোছানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে শহরের স্বনামধন্য ফার্নিচার, মোবাইল কোম্পানি, টাইলস, পেইন্টিং, এড, কার্পেট, আইটি ফার্মসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকসের শোরুমে যায় তার সহযোগীরা।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্যা ডেইলি মর্নিং এক্সপ্রেস, দৈনিক রুপকার, দৈনিক মাই বাংলা নিউজ, দৈনিক জনবাণী, মুক্তি এনজিও, নারী উন্নয়ন সংস্থা, চেতনা হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপার ও বাংলাদেশ সেফ ট্রানজিট সিস্টেম-বিএসটিএসএলসহ আরও কিছু ব্যানারে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল ইসহাক। দৈনিক রুপকার পত্রিকায় তার নাম ছিল মোহাম্মদ ইসহাক। পদবি ছিল প্রধান সম্পাদক। মর্নিং এক্সপ্রেসে নাম ছিল ইসহাক আলী। পদবি প্রধান সম্পাদক। বাংলাদেশ সেফ ট্রানজিট সিস্টেম-বিএসটিএসএল নামের প্রতিষ্ঠানে তার নাম এম ইসহাক আলী। এই প্রতিষ্ঠানে তার পদবি ছিল ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে রমনা, গুলশান, পল্টন, মতিঝিল, ওয়ারী, মুগদা, উত্তরা পশ্চিম, উত্তরা পূর্ব, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মোহাম্মদপুর, কদমতলী, তেজগাঁও, নিউমার্কেট, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ, কলারোয়া, সিরাজগঞ্জের সদর, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ দেশের আরও অনেক স্থানে একাধিক মামলা রয়েছে। এর বাইরে প্রতারিত অনেকেই দেশের বিভিন্ন থানায় জিডি করেছেন। একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে। কিছু মামলার রায় হয়েছে।
ইসহাক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় গ্রামীণ ফোনের মার্কেটিং ডিভিশনের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, আবেদনের ভিত্তিতে ইসহাকের মতিঝিলের পত্রিকা অফিসে ২ হাজার ৮০০টি পোস্টপেইড সিমকার্ড ও ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা মূল্যের ১ হাজার ৪২৩টি মোবাইল হ্যান্ডসেট সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ করা এসব সিমকার্ড ও হ্যান্ডসেটের বিপরীতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি চেক ও ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার ৬৭০ টাকার একাধিক চেক দেয়া হয়। এসব চেক ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায় অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই।
আস্থা ইলেকট্রো কোম্পানির মালিক আবু ইউসুফ মিয়াজি বলেন, ২০১৯ সালে গুলশানে চেতনা হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপার নামক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৮টি এয়ারকন্ডিশনার নিয়েছিল। আমাকে নগদ টাকা না দিয়ে চেক দিয়েছিল। প্রথমে একটি ব্যাংকের চেক দেয়ার পর দুবার ডিজঅনার হয়। পরে পূবালী ব্যাংকের আরেকটি চেক দেয়। সেই চেকটিও ডিজঅনার হয়। এর ভেতরেই সে লাপাত্তা হয়ে যায়। কোথাও তার সন্ধান পাইনি। পরে আমি গুলশান থানায় জিডি করেছি।
বিজনেস মেশিন অ্যান্ড ইকুপমেন্টের মালিক শামসুল হুদা রাসেল বলেন, ২০১৯ সালে ইসহাকের গুলশানের অফিসের জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার, ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন দিয়েছিলাম। আমরা সব সময় কর্পোরেট চুক্তি করি। সেই হিসেবে তার কোটেশনের ভিত্তিতে ৭৯ লাখ ৩৭ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য দেই। পণ্য নেয়ার পর পুরো পেমেন্ট উল্লেখ করে রুপালী ব্যাংকের এক চেকেই দিয়েছিল। কিন্তু কোনো টাকা উঠাতে পারিনি। কারণ ওই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা ছিল না। তার কোনো সন্ধান না পেয়ে কোর্টে মামলা করেছিলাম।
ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন মিঠু। তিনি ২০ বছর ধরে আইটি ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ওয়েবসাইট, সফটওয়ার ও পিএবিএক্স কাজের জন্য আমাকে ইসহাক উত্তরার হোসেন টাওয়ারে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে আমি তার অফিস দেখে অবাক হয়ে যাই। বিশাল অফিস। বেশ চাকচিক্য। এসব দেখে তাকে বিশ্বাস করি। অফার লেটার পেয়ে দেড় লাখ টাকার কাজ করে তার কাছে পেমেন্ট চাই। কিন্তু পেমেন্ট না দিয়ে সে আমাকে বলে এটি লিমিটেড কোম্পানি। কিছু নিয়মকানুন আছে। এজন্য ছবি, ভ্যাট, এনআইডি, টিন জমা দিতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি সবকিছু দেই। তারপরেও আমার টাকা দিচ্ছিল না।
এভাবে কয়েকমাস ঘোরার পর ডিসেম্বরের দিকে তার সঙ্গে আমার ঝগড়া বাধে। কথাবার্তার একপর্যায়ে আমাকে নানা রকম থ্রেট করে। কিন্তু আমি তাকে বলি আমার টাকা দিলেতো আর কোনো সমস্যা থাকেনা। তখন ইসহাক বলে আপনাকে কিসের টাকা দিবো। উল্টো আপনিই আমাকে দুই মাস কাজ করিয়ে বেতন দিচ্ছেন না।
এদিকে বিভিন্ন রেন্ট-এ কার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসহাক তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাড়ায় গাড়ি নিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিতো। গত কয়েক বছরে ইসহাক অন্তত অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাড়া নিয়ে মালিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ভাড়ায় গাড়ি নিলেও প্রথম মাসের ভাড়া দেয়ার পর আর কোনো ভাড়া দিতো না। মাসের পর মাস ভাড়া আটকে দিতো। কিছুদিন পর যে প্রতিষ্ঠানের নামে ভাড়া নিতো সেটি বন্ধ করে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যেতো।
২০১৩ সালে ইসহাকের দ্বারা ৪৪ জন ব্যক্তি প্রতারিত হয়েছিলেন। প্রতারিতরা গণস্বাক্ষর করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জমা দিয়েছিলেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সিআইডি ২০১৪ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে। শুধু তাই নয় ২০০৬ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের নামে ইসহাক অর্ধশতাধিক গরিব ও অসহায় মানুষকে সেলাই মেশিন ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, প্রতারণার মাস্টার ইসহাকের মূল অস্ত্র ছিল অত্যাধুনিক অফিস সেটআপ। অফিস দেখিয়েই মূলত মানুষকে বোকা বানাতো। সে কাউকেই নগদ টাকা দিতো না। ভুয়া চেক দিতো লম্বা তারিখ লিখে। উচ্চ বেতনে চাকরি দেয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা জামানত নিতো। বিভিন্ন ব্যক্তিদের স্বাক্ষর জাল করার দক্ষতাও ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হলে নিজে নিজেই চুক্তি করতো। পক্ষ-বিপক্ষ কাউকে রাখতো না। ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করার দক্ষতাও ছিল তার। এছাড়া অফিস উদ্বোধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সমাজের নামিদামী ব্যক্তিদের হাইলাইটস করতো।
মামলার তদন্ত করছে সিআইডি।তারা জানিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে আরেকটা মামলার তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটও জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়া পিবিআই, পুলিশ ও সিআইডি তদন্ত করছে এ রকম ১৫টি মামলার তথ্য আমরা পেয়েছি। তিনি বলেন, গুলশানের তাহের টাওয়ারে সাড়ে ৬ হাজার স্কয়ার ফুটের অফিস ভাড়া নেয়ার সময় নগদ টাকা না দিয়ে ব্যাংকের চেক দিয়ে ভাড়া নেয়। তারপর ডেকোরেশনের জন্য আরএফএল থেকে এসি, হাতিল থেকে ফার্নিচার, ওই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে ৯০ লাখ টাকার ল্যাপটপ, অফিস উদ্বোধনের দিন গুলশানের প্রিমিয়াম সুইটস থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকার মিষ্টি নিয়ে টাকা দেয়নি। একেবারে বিনা পুঁজিতে বাকিতে পণ্য এনে প্রতারণা করতো।










