ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি হত্যার বিচার হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ হারানো এবং গুম-খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার আইনসম্মত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হবে। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্বই নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের পর আয়োজিত ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, গুম হয়েছেন বা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকার একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর আওতায় শহীদ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা, সামাজিক কিংবা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের নামকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি জাতি তার আত্মত্যাগী সন্তানদের স্মরণে যে সম্মান প্রদর্শন করে, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা হয়ে থাকে।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো অপরাধ বিচারহীন থাকলে সমাজে অন্যায়ের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। তাই রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া হবে এমন, যাতে ভুক্তভোগী পরিবার, সাধারণ জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহল—সবার কাছেই তা গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠান যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক বর্ণনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না হয়। বরং এটি হবে জনগণের সম্মিলিত সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার একটি নিরপেক্ষ দলিল।
তার ভাষায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। ছাত্র, তরুণ, নারী, শ্রমজীবী ও সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণই সেই আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছিল। আর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার মূল্যবোধকে রক্ষা করা।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বীরদের মতোই গণ-অভ্যুত্থানে জীবনদানকারী ব্যক্তিদের অবদানও জাতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময় কৃত্রিম ইস্যু তৈরি করে সমাজে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবেও অতীতের স্বৈরাচারী শক্তির পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে দায়িত্বশীল আচরণ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময়ের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সেই সময়ে অসংখ্য মানুষ গুম, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। বহু পরিবার বছরের পর বছর স্বজনের সন্ধান না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু প্রাণ হারিয়েছেন। আন্দোলন দমনে কঠোর শক্তি প্রয়োগ এবং বিভিন্ন সহিংস ঘটনার অভিযোগ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে, যার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও বিচার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতন, গুম বা হত্যার শিকার হতে হবে না।
তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন দেশে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সুসংহত হবে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি/ জাতীয়










