সিরাজগঞ্জে এমপির গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ
হামলার প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি
অনলাইন ডেস্ক, সিরাজগঞ্জ:
সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনের সংসদ সদস্য ভিপি মো. আয়নুল হকের গাড়িবহরে হামলা ও একটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রায়গঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
শনিবার বিকেলে রায়গঞ্জ পৌরসভার ধানগড়া আড়চালা এলাকায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) উপজেলা পরিষদের কাছাকাছি স্থাপনের দাবিতে আয়োজিত একটি সুধী সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা শেষে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভা শেষে সংসদ সদস্য আয়নুল হক গাড়িবহর নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার সময় সেখানে হঠাৎ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাঁর গাড়িবহর লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। এ সময় একটি গাড়ির পেছনের কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য আয়নুল হক দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁর গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং হামলাকারীদের কয়েকজনকে দেখেছেন। তাঁর ব্যবহৃত গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, তাঁকে লক্ষ্য করেই হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীদের হাতে অস্ত্র থাকার দাবিও করেন তিনি। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
গাড়িবহরে হামলার প্রতিবাদে শনিবার রাতে রায়গঞ্জ উপজেলা বিএনপি ও চান্দাইকোনা ইউনিয়ন বিএনপির উদ্যোগে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের চান্দাইকোনা এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, একজন জনপ্রতিনিধির গাড়িবহরে প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা জননিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও উঠেছে। সংসদ সদস্যের সঙ্গে থাকা পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মী ফয়সল বিশ্বাস অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির, এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতাকর্মী হামলায় জড়িত ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নেতারা।
রায়গঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ডা. এস এম মুনসুর আলী বলেন, ঘটনার সময় তিনি সিরাজগঞ্জ শহরে ছিলেন। ফলে ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি সরাসরি কিছু জানেন না। হামলার সঙ্গে জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। একই সঙ্গে হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও মুখপাত্র অধ্যাপক জাহিদুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের জেরে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়ে এর দায় অন্য রাজনৈতিক দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তাঁর এ বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এনসিপির সিরাজগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক মেহেদী হাসানও তাঁদের দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এনসিপির নেতাকর্মীদের এ ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মো. শেখ রিয়াদ ও শ্রাবণ অভিযোগ করেন, ফয়সল বিশ্বাসকে ওই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাঁদের দাবি, তিনি অনুষ্ঠানে এসে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর হামলায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংসদ সদস্যের গাড়িবহর ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময়ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে তাঁদের দাবি। এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও তাঁরা জানান।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার কোথায় স্থাপন করা হবে—এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আগে থেকেই মতভেদ রয়েছে। উপজেলা পরিষদের কাছাকাছি টিটিসি স্থাপনের দাবিতে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্য প্রকাশ পায়।
এ ছাড়া স্থানীয় সীমানা ও জায়গা নির্ধারণকে কেন্দ্র করেও বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে সভাস্থলে উত্তেজনা তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গাড়িবহরে হামলার সঙ্গে এসব বিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ঘটনার পর ধানগড়া ও চান্দাইকোনা এলাকায় পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। রায়গঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
রায়গঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইদুল ইসলাম খান বলেন, গাড়িবহরে হামলার খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও হামলার প্রকৃত কারণ এবং কারা সরাসরি এতে জড়িত ছিলেন, তা নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পাওয়া তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সংসদ সদস্যের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রায়গঞ্জে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকেও।
পরিস্থিতি যাতে আর উত্তপ্ত না হয়, সে জন্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সংযত থাকা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জেলা










