কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য ফেসবুকের নতুন এআই উদ্যোগ

‘ক্রিয়েটর স্টুডিও’তে পোস্ট বিশ্লেষণ থেকে কমেন্টের উত্তর—সবই হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায়

কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য ফেসবুকের নতুন এআই উদ্যোগ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

প্রযুক্তি প্রতিবেদক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতাদের আরও বেশি সময় নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ফেসবুক। নির্মাতাদের জন্য ‘ক্রিয়েটর স্টুডিও’ নামে আলাদা একটি অ্যাপ চালু করেছে মেটা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর এই অ্যাপের মাধ্যমে কনটেন্টের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ, দর্শকদের প্রতিক্রিয়া বোঝা, পোস্টের সময় নির্ধারণ এবং কমেন্টের উত্তর তৈরিসহ বিভিন্ন কাজ সহজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর অ্যাপটি আইওএস ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নির্বাচিত কনটেন্ট নির্মাতারাই এটি ব্যবহার করতে পারছেন। নতুন এই উদ্যোগকে ফেসবুকের কনটেন্ট নির্মাতা-কেন্দ্রিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফেসবুকে নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশকারী নির্মাতাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিজেদের কনটেন্টের পারফরম্যান্স বুঝতে বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা। কোন পোস্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, কোন সময়ে দর্শকের সক্রিয়তা বেশি, কোন ধরনের কনটেন্টে বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে—এসব জানতে এতদিন বিভিন্ন ড্যাশবোর্ড ও বিশ্লেষণাত্মক তথ্য দেখতে হতো।

‘ক্রিয়েটর স্টুডিও’ সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে। এতে থাকা ‘এআই ক্রিয়েটর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ নির্মাতার কাজের ধরন, নির্ধারিত লক্ষ্য এবং দর্শকদের আচরণ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য তৈরি।

ফলে একজন নির্মাতাকে প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে খুঁজে বের করার পরিবর্তে সরাসরি এআই সহকারীর কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যেমন—কোন সময়ে পোস্ট করা ভালো হবে, সাম্প্রতিক পোস্টগুলো কেমন করছে, দর্শকেরা কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে কিংবা কোনো পোস্টে মানুষের প্রতিক্রিয়া কী ধরনের—এসব প্রশ্নের সহজ ভাষায় উত্তর পাওয়ার ব্যবস্থা থাকছে।

নতুন অ্যাপটির উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর একটি হলো এআইভিত্তিক কমেন্ট ব্যবস্থাপনা। কোনো পোস্টে বিপুলসংখ্যক মন্তব্য এলে সবগুলো দেখা এবং প্রয়োজনীয় মন্তব্যের উত্তর দেওয়া কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।

ক্রিয়েটর স্টুডিওর এআই টুল গুরুত্বপূর্ণ বা প্রাসঙ্গিক মন্তব্যগুলো শনাক্ত করতে পারবে। এরপর নির্মাতার সাধারণ যোগাযোগের ধরন বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য উত্তরের একটি খসড়াও তৈরি করতে পারবে।

তবে তৈরি করা উত্তর সরাসরি প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা নেই। নির্মাতা চাইলে সেটি নিজের মতো করে সম্পাদনা করে তারপর প্রকাশ করতে পারবেন। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়তার সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি নিজের বক্তব্যের নিয়ন্ত্রণও নির্মাতার হাতেই থাকবে।

অ্যাপটির আরেকটি সুবিধা হলো নির্মাতাদের প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে একটি নির্দিষ্ট তালিকায় সাজিয়ে দেওয়া। অ্যাপে প্রবেশ করার পর তারা আগের পোস্টগুলোর অবস্থা, নির্ধারিত লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে এবং কোন কোন দর্শকের মন্তব্যের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন—এসব তথ্য এক জায়গায় দেখতে পারবেন।

ফলে আলাদা আলাদা বিভাগে গিয়ে তথ্য খোঁজার প্রয়োজন কমবে। বিশেষ করে নিয়মিত ভিডিও, ছবি, লেখা বা অন্যান্য ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করেন এমন নির্মাতাদের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা সহজ করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

কনটেন্ট নির্মাতাদের ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নির্মাতাদের জন্য আলাদা সুবিধা, বিশ্লেষণ ব্যবস্থা ও আয়সংক্রান্ত সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফেসবুকও নির্মাতাদের জন্য নিজেদের প্ল্যাটফর্মকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করছে।

ক্রিয়েটর স্টুডিও সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। এআইকে সরাসরি কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে নির্মাতাদের কাজের সময় কমানো এবং তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে মেটা।

এর পাশাপাশি বাইরের এআই সেবা বা অন্যান্য বিশ্লেষণাত্মক টুলের ওপর নির্মাতাদের নির্ভরতা কমানোও উদ্যোগটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ কনটেন্ট তৈরির পর সেটির ফলাফল বোঝা, দর্শকের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী কনটেন্টের পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা যেন ফেসবুকের নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যেই পাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

মেটা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর চাহিদা ও সামাজিক যোগাযোগের ধরন বিবেচনায় নিয়ে একাধিক নতুন অ্যাপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এর মধ্যে ফেসবুক গ্রুপকেন্দ্রিক আলোচনার জন্য রেডিটের আদলে ‘ফোরাম’, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি ভাগাভাগির জন্য ‘ইনস্ট্যান্টস’, গেমিংয়ের জন্য ‘পকেট’ এবং শিশুদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গল্প তৈরির ‘স্টোরিকিট’ রয়েছে।

এসব উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, মেটা শুধু মূল ফেসবুক অ্যাপের ওপর নির্ভর না করে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা সেবা তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

বর্তমানে সীমিত অঞ্চলের আইওএস ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্রিয়েটর স্টুডিওর ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে এর পরিসর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এআইনির্ভর কনটেন্ট বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা জনপ্রিয় হলে এটি ফেসবুকের পেশাদার নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

তবে এআইয়ের দেওয়া পরামর্শ কতটা কার্যকর হবে এবং নির্মাতারা নিজেদের কনটেন্ট কৌশল নির্ধারণে এর ওপর কতটা নির্ভর করবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ কনটেন্ট নির্মাণে দর্শকের পছন্দ, সময়োপযোগী বিষয় এবং সৃজনশীলতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, ‘ক্রিয়েটর স্টুডিও’ চালুর মাধ্যমে ফেসবুক কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য কেবল নতুন একটি অ্যাপই আনেনি; বরং এআইকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি, দর্শক বিশ্লেষণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার একটি নতুন মডেল সামনে এনেছে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// স্পেশাল