দানকৃত সম্পত্তিতেও আজীবন ভোগদখলের অধিকার থাকবে দাতার, মন্ত্রিসভায় সংশোধনী আইনের অনুমোদন
গুম প্রতিরোধে নতুন আইন, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিধান; বহাল থাকছে ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্পত্তি দান করার পরও দাতা যেন জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারেন, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তনের পথে এগিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর সংশোধিত খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন বিধান কার্যকর হলে সম্পত্তির মালিকানা দানগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর হলেও দাতা তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন আইনের খসড়া ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
বর্তমানে প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি দান করলে সেই সম্পত্তির মালিকানা এবং ভোগদখলের অধিকার একযোগে দানগ্রহীতার কাছে চলে যায়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দাতারা নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও দান করা সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারেন না। নতুন সংশোধনীতে এ বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়ে দাতার জন্য আজীবন ভোগ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সম্পর্ক, উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সংশোধনী ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিরা জীবদ্দশায় সন্তান বা নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করলেও নিজেদের আবাসন বা কৃষিজমি ব্যবহারের অধিকার হারাবেন না। এতে পারিবারিক বিরোধ ও অনিশ্চয়তা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
একই বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়াও অনুমোদন পেয়েছে। সরকার বলছে, এই আইন গুম প্রতিরোধ, ঘটনার তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ আইনগত কাঠামো তৈরি করবে।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের ঘটনায় আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করা যাবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলেও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার পরিচালনার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারের জন্য তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত অবস্থা এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে পৃথক ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র নিজস্ব তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ঔষধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
এর ফলে ২০২৬ সালের নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। পরিবর্তে ১৯৯৪ সালে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেই সময়ের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা নিয়ে আরও পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতেই সরকার আপাতত আগের ব্যবস্থাকে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ এবং ওষুধ নীতিমালা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দেশের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সম্পত্তি দানের পরও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়










