ডিজিটাল জুয়ার বিরুদ্ধে যুগান্তকারী আইন পাশ

অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং ও মিথ্যা লাভের প্রলোভনে কঠোর শাস্তি; ভিপিএন ব্যবহার, অর্থপাচার, অ্যাফিলিয়েট প্রচারণা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও আইনের আওতায়।

ডিজিটাল জুয়ার বিরুদ্ধে যুগান্তকারী আইন পাশ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের আইনি শূন্যতা দূর করতে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’। নতুন এ আইনের মাধ্যমে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ রহিত করা হয়েছে।

সরকারের দাবি, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল ওয়ালেট এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিস্তৃত জুয়ার নতুন বাস্তবতায় আধুনিক আইন প্রণয়ন ছিল সময়ের দাবি।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস হয়।

এর আগে বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য বিলটি আরও পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো এবং জনমত গ্রহণের প্রস্তাব দিলেও কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়ে যায়।

বিল উত্থাপনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে জুয়ার প্রচলিত ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন দেশের ভেতরে বা দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত অসংখ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে জুয়া পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ১৮৬৭ সালের আইন কার্যকর নয়। তাই প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ও বিস্তৃত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া শুধু সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ নয়; এটি সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক অপরাধ, অর্থপাচার, পরিচয় জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শুধু খেলোয়াড় নয়, জুয়ার পুরো ইকোসিস্টেমকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

১৪ ধরনের অপরাধকে শাস্তিযোগ্য ঘোষণা

নতুন আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মোট ১৪ ধরনের অপরাধ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
  • অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া পরিচালনা।
  • অনলাইন বেটিং ও ওয়েজারিং।
  • জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার।
  • জুয়ার সরঞ্জাম প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিক্রি, বিতরণ বা ব্যবহার।
  • পেশাদার বুকমেকার বা বাজিকর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা।
  • ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং।
  • জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি।
  • স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ব্যবহারকারী সংগ্রহ।
  • ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা।
  • ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ও বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা।
  • ব্যাংক, ডিজিটাল ওয়ালেট, এমএফএস, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন ও অর্থপাচার।

সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান

আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মাত্রার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অনলাইন বেটিং পরিচালনা বা সংশ্লিষ্ট অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। জুয়ার সরঞ্জাম প্রস্তুত, আমদানি, বিক্রি বা বিতরণের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি আদালত এসব সামগ্রী বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংসের নির্দেশ দিতে পারবেন।

পেশাদার বুকমেকার বা বাজিকর হিসেবে পরিচালনার জন্যও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন ও মিথ্যা লাভের প্রলোভনও অপরাধ

আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, সহজে লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কিংবা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে জুয়ার সঙ্গে যুক্ত করাও এখন দণ্ডনীয় অপরাধ।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় কিংবা সেলিব্রিটি—যে কেউ অপরাধে সম্পৃক্ত হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনায় ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্লাউড সার্ভিস, ডোমেইন হোস্টিং বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) ব্যবহার করলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, জাল বায়োমেট্রিক তথ্য কিংবা ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে জুয়া পরিচালনা বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, আর স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এছাড়া আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিংবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করতে পারবেন।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, পেমেন্ট গেটওয়ে, হোস্টিং প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো করপোরেট সংস্থার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিচালক, ব্যবস্থাপক, নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও অভিযুক্ত করা যাবে।

তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতে সংঘটিত হয়েছে এবং তিনি তা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনের আওতায় অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধলব্ধ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইসসহ অন্যান্য সম্পদ আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে।

তদন্ত চলাকালে আদালতের অনুমতি নিয়ে ব্যাংক হিসাব, এমএফএস বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সরকার বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ ও চ্যানেল ব্লক, অপসারণ অথবা নিষিদ্ধ করতে পারবে।

একই সঙ্গে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট বন্ধের নির্দেশও দেওয়া যাবে।

সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচার

অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতে। আইনের অধীন সব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তা পালন করতে পারবেন না।

আইনে জুয়া প্রতিরোধে একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তিকরণ ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক পরিচয় যাচাই এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়ার বড় অংশ বিদেশভিত্তিক সার্ভার ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার সহজলভ্যতা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আসক্তি, ঋণগ্রস্ততা, পারিবারিক সংকট ও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল শিক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের জন্য পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের অভিমত, নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন দেশের ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় এবং আইনের নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগের ওপর।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়