শ্রীপুরে বিকাশকর্মীদের গাড়িতে গুলি, দুই বস্তায় আড়াই কোটি টাকা লুট

তিন বস্তায় ছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা, ক্যাশ ম্যানেজার গুলিবিদ্ধসহ আহত ৪

শ্রীপুরে বিকাশকর্মীদের গাড়িতে গুলি, দুই বস্তায় আড়াই কোটি টাকা লুট
প্রতীকী ছবি

মো: মেহেদী হাসান:

গাজীপুরের শ্রীপুরে বিকাশকর্মীদের বহনকারী একটি প্রাইভেটকারে গুলি চালিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। নরসিংদী থেকে মাওনার উদ্দেশে নিয়ে আসা প্রায় চার কোটি টাকা তিনটি প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা ছিল। দুর্বৃত্তরা গাড়ির গতিরোধ করে গুলি ও মারধরের পর দুটি বস্তা নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বিকাশের এক ক্যাশ ম্যানেজার গুলিবিদ্ধসহ চারজন আহত হয়েছেন।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে শ্রীপুর-গোসিংগা আঞ্চলিক সড়কের কর্ণপুর এলাকার বনবেষ্টিত নির্জন স্থানে এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ ক্যাশ ম্যানেজার হিমেলকে (৩৫) আশঙ্কাজনক অবস্থায় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আহত অন্যরা হলেন ভালুকা এন্টারপ্রাইজ শ্রীপুরের ডিসিএম মো. ফাহাদ হোসেন (৩০), মাওনা বিকাশের সুপারভাইজার রিফাত (২০) এবং গাড়িচালক লাল মিয়া (২৫)। হিমেলের বাড়ি শ্রীপুর পৌর এলাকার বেরাইদেরচালা গ্রামে।

আহত বিকাশকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর বিভিন্ন এজেন্টের কাছ থেকে দিনভর প্রায় চার কোটি টাকা সংগ্রহ করেন তাঁরা। পরে টাকা তিনটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে একটি প্রাইভেটকারে করে মাওনার উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িতে তিনজন কর্মকর্তা ও একজন চালক ছিলেন।

গাড়িটি শ্রীপুর-গোসিংগা আঞ্চলিক সড়কের কর্ণপুর এলাকার নির্জন ও বনঘেরা অংশে পৌঁছালে ১২ থেকে ১৫টি মোটরসাইকেলে আসা একদল দুর্বৃত্ত তাদের পথ আটকে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এরপর দুর্বৃত্তরা গাড়ির কাচ ভেঙে ভেতরে থাকা ক্যাশ ম্যানেজার হিমেলের পেটে গুলি করে। তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে অন্য দুই কর্মকর্তা ও চালককে রড ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে গাড়ির পেছনের অংশ খুলে টাকাভর্তি তিনটি বস্তার মধ্যে দুটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

প্রাথমিকভাবে ছিনিয়ে নেওয়া দুই বস্তায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ হিসাব-নিকাশ ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় আহত চারজনকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে হিমেলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অনিক সরকার জানান, রক্তাক্ত অবস্থায় চারজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে একজনের পেটে গুলির গভীর ক্ষত ছিল। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। অন্য তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিবহনের সময় পুলিশের সহায়তা বা বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, প্রায় চার কোটি টাকা পরিবহনের বিষয়ে বিকাশের পক্ষ থেকে পুলিশের কোনো সহায়তা চাওয়া হয়নি। নরসিংদী, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর এলাকার ওপর দিয়ে টাকা বহন করা হলেও সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এমনকি জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এও যোগাযোগ করা হয়নি।

ওসি আরও জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে থাকা তিন বস্তা টাকার মধ্যে দুটি বস্তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে আনুমানিক আড়াই কোটি টাকা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং ছিনতাই হওয়া টাকা উদ্ধারে তদন্ত ও অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্বৃত্তদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের সংখ্যা, পালিয়ে যাওয়ার পথ, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় একদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিবহনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অন্যদিকে পরিকল্পিতভাবে গাড়ির গতিরোধ করে হামলা চালানোর বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

চার কোটি টাকার চালান সম্পর্কে দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই তথ্য পেয়েছিল কি না, তারা কীভাবে গাড়িটির গতিবিধি জানতে পেরেছিল এবং ছিনতাইয়ের পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

গুলিবিদ্ধ ক্যাশ ম্যানেজারের চিকিৎসা, ছিনতাই হওয়া অর্থের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে এ ঘটনার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম