তারেক রহমানের নেতৃত্বে উন্নয়নের নতুন রূপরেখা, অগ্রাধিকার পাচ্ছে অর্থনীতি-শিক্ষা-জ্বালানি
আতিকুল্লাহ আরেফিন রাসেল:
বাংলাদেশের নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন নীতিগত ঘোষণায় এসব খাতকে সামনে রাখা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা। একই অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং আবাসন ও কমিউনিটি সুবিধাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে রাখা হয়েছে।
‘থ্রি-আর’ কৌশলে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য ‘থ্রি-আর’—Recovery, Restoration ও Reconstruction—কৌশলের কথা তুলে ধরেন। সরকারের ব্যাখ্যায় এর লক্ষ্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনঃস্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী একই ভাষণে বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য রয়েছে।
শিক্ষায় বড় বরাদ্দ ও নতুন সামাজিক উদ্যোগ
সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের ভাষণ অনুযায়ী, চলতি বাজেটে শিক্ষা খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষায় জিডিপির অংশ ধাপে ধাপে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি খেলাধুলাকে শিক্ষার অংশ করার কথাও বলা হয়েছে। সরকারের হিসাবে, জুনে আয়োজিত মাসব্যাপী স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকে জনগণ ও শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। সরকার দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় একাধিক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় গুরুত্ব
উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনা ও নদীভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদীভাঙন, পরিবেশ এবং উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তবে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
সমুদ্র অর্থনীতিকে উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সরকার
সাম্প্রতিক বিশ্ব নৌ দিবসের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সবুজ নৌপরিবহন, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল লজিস্টিকস, হাইড্রোগ্রাফি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নাবিকদের দক্ষতা উন্নয়ন।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। ফলে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনা
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আলোচনায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিও এসেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিএনপি সরকারের উদ্যোগে চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন কাঠামো, উপকারভোগী নির্বাচন, অর্থের উৎস এবং মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা—এসব বিষয় বাস্তবায়নের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উন্নয়ন বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা
সরকারের সামনে উন্নয়নের পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতার প্রশ্নটিও রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি আগের সংশোধিত এডিপির তুলনায় বড় আকারের। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
ফলে নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা শুধু বাজেটের আকার বা প্রকল্প ঘোষণায় নির্ধারিত হবে না; বরং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থের সঠিক ব্যবহার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন কতটা আসে—সেটিই হবে বড় মাপকাঠি।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ এবং সাম্প্রতিক সরকারি ঘোষণাগুলো থেকে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি শিক্ষা, জ্বালানি, অবকাঠামো, সমুদ্র অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত উন্নয়ন কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এর বাস্তব ফলাফল আগামী মাসগুলোতে সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক সূচকের ওপর আরও স্পষ্ট হবে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি//জাতীয়










