১২৭ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আইন বাতিল, যুগোপযোগী ডাকসেবা অধ্যাদেশের অনুমোদন
ক্রাইম ডায়রি ডেস্কঃ
১২৭ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আইন বাতিল, যুগোপযোগী ডাকসেবা অধ্যাদেশের অনুমোদন দিল সরকার।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ‘দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, ১৮৯৮’ অবসান ঘটিয়ে দেশের ডাকব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হলো। সরকার ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী আইন চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অধ্যাদেশের অনুমোদন দেওয়া হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসীম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় রূপান্তর, ই-কমার্স কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা জোরদার করা।
এই আইনের আওতায় প্রথমবারের মতো আইনিভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘মেইলিং ও কুরিয়ার লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ডাক ও কুরিয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স প্রদান, তদারকি ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণ করবে এই কর্তৃপক্ষ।
পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্বার্থের সংঘাত এড়াতে একটি ‘পোস্টাল কাউন্সিল’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া ডাক বা কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সর্বোচ্চ জরিমানা ছিল ২ লাখ টাকা, নতুন অধ্যাদেশে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডাককে সর্বজনীন সেবা প্রদানের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ অন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহার করতে হলে আলাদা হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে। আন্তর্জাতিক ডাক সংস্থা ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ)-এর স্বীকৃত ‘ডেজিগনেটেড অপারেটর’ হিসেবেই বাংলাদেশ ডাক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রচলিত কাগুজে ডাকটিকিটের পাশাপাশি চালু হচ্ছে ডিজিটাল ডাকটিকিট বা ই-স্ট্যাম্পিং ব্যবস্থা। গ্রাহক অনলাইনে মূল্য পরিশোধ করে কিউআর কোড বা বারকোড ব্যবহার করে ডাকসেবা নিতে পারবেন, যা প্রচলিত টিকিটের সমানভাবে বৈধ হবে।
গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাকসেবার অপব্যবহার ঠেকাতে প্রেরক ও প্রাপকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে কেওয়াইসি (KYC) প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে।
নতুন আইনে ডাকসেবাকে ‘জরুরি সেবা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা যে কোনো জাতীয় দুর্যোগ বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। বাংলাদেশ ডাকের অবকাঠামোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক’ হিসেবে।
এ ছাড়া এরিয়া কোড, স্ট্রিট কোড ও হাউজ কোডভিত্তিক ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থা এবং জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি চালুর পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঠিকানা হারানো ব্যক্তিদের জন্য নতুন করে ডিজিটাল ঠিকানা নির্ধারণ ও আর্কাইভে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
গ্রাহকসেবাকে আরও সহজ করতে চালু হচ্ছে সেন্ট্রাল লজিস্টিকস ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম (CLTP), যেখানে সব অপারেটরের মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা হবে। কুরিয়ার খাতে শৃঙ্খলা আনতে যুক্ত করা হয়েছে এস্ক্রো-ভিত্তিক পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবস্থা।
অধ্যাদেশে ডাক জীবন বিমা ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংককে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ‘অধিকারী ডাকসেবা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ডাক জীবন বিমার প্রতিটি পলিসি থাকবে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় এবং সঞ্চয় ব্যাংকের সব আমানত সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি // জাতীয়










