সীমান্তে হত্যার না বলা গল্প
চন্দন চ্যাটার্জী, কলকাতা থেকে
সীমান্তে চোরাকারবারি হত্যা নিয়ে ধারাবাহিক গল্প---২য় পর্ব।
বাংলাদেশ ভারতের সাথে ৪,০৯৬ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমানার বন্ধুত্বের বন্ধনে ঘিরে রয়েছে যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ২,২১৬ কিলোমিটার, আসামে ২৬৩ কিলোমিটার, মেঘালয়ে ৪৪৩ কিলোমিটার, ত্রিপুরায় ৮৬৫ কিলোমিটার এবং মিজোরামের ৩১৮ কিলোমিটার বিস্তৃত। বাংলাদেশের ৩২টি সীমান্ত জেলা রয়েছে আর ভারতের রয়েছে পাঁচটি সীমান্ত প্রদেশ।
১৯৯০ সাল থেকে উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক লেনদেন দ্রæতগতিতে বেড়ে চলছে আর এ কারণে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-দের এখন বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্ত দিয়ে গরু, স্বর্ণ, অবৈধ অস্ত্র, মানব পাচার প্রতিহত করা।
সীমান্তে নি¤œবিত্তÍ আয়ের মানুষরাই গরু চালানের অধিকাংশ দায়ের সাথে জড়িত।
পশ্চিমবঙ্গেই ৬৮টি চোরাচালান করিডর রয়েছে এবং ১৪৯টি স্পর্শকাতর সীমান্তবর্তী গ্রাম রয়েছে। এ ছাড়াও ঈদ-উজ-জোহার মতো ধর্মীয় পবিত্র সময়গুলোতে গবাদিপশুর চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় বাংলাদেশে একটি গরু বিক্রি হয় চল্লিশ হাজার বাংলাদেশী টাকায় যেখানে ভারতে তার দাম থাকে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ হাজার টাকা। এসব কারণে গরু বহনকারীদের কাছে ঝুঁকির চেয়ে এ প্রাপ্তিটাই বেশি আনন্দের হয়ে যায়। এমনকি এই পাচারকাজে শিশুদেরও নিয়োগ করা হয়।
বিএসএফ বাংলা-ভারত সীমান্তের বিশেষতঃ পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অংশটিতে গরু পাচারের প্রহরার দুর্বলতা, সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার অব্যবস্থাপনা, সীমান্তরক্ষীদের ওপর উভয় দেশের সীমান্ত পাচারকারী সিন্ডিকেটের আক্রমণের কারণগুলোর জন্য বিশাল পরিমাণে ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি সীমান্তের অদ্ভুত অবস্থান, নহল ও নদীগুলোর সংকুচিত অবস্থান এবং বিভিন্ন চর এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোর কারণে এই প্রহরাকর্ম অসুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।
গরু চোরাচালানী রাখালের এক একটি দলের ২৫০ থেকে ৩০০ জন মানুষ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে, কুয়াশা, সারকান্দাজাতীয় উচ্চ ঘাসের আড়ালের সুযোগ নিয়ে, বহরমপুর ও মালদহ নদী সীমান্তের নহলাদির সুযোগ নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের ভেতর ঢুকে পড়ে। এমন ধরণের ছোট ছোট ৪০-৫০ জন রাখালের দলও কোলকাতা ও কৃষ্ণনগরের এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ও দূর্বল বেড়ার এলাকা দিয়ে ঢোকার সুযোগ নেয়। এসব দল মারণাস্ত্র, দা, কাস্তে, ছোরা, এমনকি বহুদূর পর্যন্ত যায় এমন টর্চে সজ্জিত থাকে।
দেখা গেছে, অনেক সময় তারা স্থানীয়ভাবে তৈরি বোম (সচরাচর স্থানীয়ভাবে সকেট বোমা নামে পরিচিত), পিস্তল, রিভালভার সাথে রাখে।
চোলাচালানীরা সচরাচর সীমান্তের ওই পাড়ে গরু ছেড়ে দেয় যেখানে সচরাচর নদী ৭০০-৮০০ মিটার প্রশস্ত। কলাগাছের কাÐ দড়ি দিয়ে বেঁধে তার মাঝখানে গরু বেঁধে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর চব্বিশ পরগণা ও নদীয়া জেলার বর্ষার জলে ভরা নদীগুলোতে ফেলে দেয়া হয়। বিএসএফ ৪৫ বাটেলিয়ান সীমান্তে ৭২৫টি চৌকিতে তাদের পাহারা বর্ধিত করেছে।
এসব এলাকার যে কেউ সহজে আন্দাজ করতে পারে যে এ পাড়ের চোরাচালানকারীদের সাথে ওপাড়ের চোরাচালানকারীদের সীমান্তরক্ষীদের গতিবিধির বিষয়ে খুব ভালো যোগাযোগ থাকে। বিএসএফ যখন তাদের গতিরোধ করে দাঁড়ায়, তখন তারা সেসবের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ধারালো অস্ত্র ও অন্যান্য cমারণাস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। বাংলাদেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রায়ই বিএসএফ-এর বিচার-বহির্ভূত হত্যার খবর পরিবেশন করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিএসএফ যখন আক্রান্ত হয় বা তাদের জীবন যখন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে, কেবল তখনই তারা মারণাস্ত্রের প্রয়োগ ঘটায়।
২০১৯ সালে এমন ধরণের ঘটনায় টহলরত অবস্থায় একজন বিএসএফ মারা যায় এবং ৮৩ জন আহত হয়। এসময় ১২ জন বাংলাদেশী নাগরিক এবং ১১ জন ভারতীয় চোরাচালানী এসব অনভিপ্রেত ঘটনায় প্রাণ হারায় (যেখানে বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় মৃতের এ সংখ্যা ৩৪ বলে উল্লেখ করা হয়)। এখানে আরো উল্লেখ করতে হয় যে, মালদহ সেক্টরের ২৩ নম্বর কেদারিপাদা সীমান্ত চৌকিতে ২৩ জানুয়ারিতে এমন একটি ঘটনা সংঘটিত হয়।
নদী সীমান্ত অঞ্চলে গবাদিপশু চোরাচালানের সম্ভাব্য একটি রাখালদলের অনুপ্রবেশের খবর বিজিবিকে আগেই জানানো হয়েছিল। বিএসএফ দলের সদস্যরা এই চোরাকারবারী রাখালদলের লোকদের দ্বারাই আক্রান্ত হয় যে ঘটনায় ২ বাংলাদেশীর মৃত্যু ঘটে যার মধ্যে একজন ভারতীয় এলাকার পুকুরে ডুবে নিজেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল। এ ঘটনায় পাঁচ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী আহত হয়।
২০১১ সাল থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা চোরাকারবারীদের সাথে অ-প্রাণঘাতী রণকৌশলের নীতি অবলম্বন করে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে এবং চোরাচালানীদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং সহযোদ্ধাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ২০১০ সাল থেকে ১০৭ জন ভারতীয় চোরাকারবারী (বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ-এর মতে ৮৬ জন) এবং ১৩৩ জন চোরাচালানকারী/অপরাধী বিএসএফ-এর সাথে সংঘর্ষে মারা যায়।
১৮৯৮টি বিএসএফ-এর অ-প্রাণঘাতী রণকৌশলের নীতির ঘটনা রয়েছে যার আসামীরা হচ্ছে বাংলাদেশীয় চোরাকারবারী বা অপরাধী। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৯৬০ জন বিএসএফ সদস্য গুরুতরভাবে আহত হয় এবং ১১ জন সদস্য বাংলাদেশী চোরাকারবারীদের আক্রমণে প্রাণ হারায়।
এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গ এলাকার আইবি বরাবর ১৫৯টি সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিত করা হয়। সীমান্তে আরো উন্নত নজরদারী বাড়ানোর কারণে গবাদিপশু চোরাচালানীরা ক্রমাগত আরো মরিয়া ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এটি প্রমাণিত হয় চোরাচালানীদের কাঁটাতার অমান্যের ঘটনায় (৭৪৬টি ঘটনায়) এবং বিএসএফ দলের ওপর হামলার ধরণে।
বাংলাদেশের সাথে যেসব আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকা রয়েছে সেগুলোর সুরক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত চৌকির শক্তিশালীকরণ, বেড়ার ছাড়াও মানুষের প্রবেশে শারিরীক প্রতিবন্ধকতা নির্মাণ, সীমান্তের উন্মুক্ত সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্টের রুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি ইত্যাদি এবং আরো বেশি ফ্লাডলাইট ও সীমান্ত চৌকির নির্মাণ।
যাহোক, দুই বাহিনীর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে সীমান্ত এলাকার জনগণের মাঝে সচেতনা বৃদ্ধি করলে হয়ত এসব অঘটনগুলোকে কমিয়ে আনা যেতে পারে। এ ছাড়াও সীমান্তে আরো উন্নতমাণের বেড়া নির্মাণ করলেও দুই বাহিনীকে শান্তির জন্য আরো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে হবে।


crimediarybd1








