উল্টোপথের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানির দায় নেবে কে?

উল্টোপথের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানির দায় নেবে কে?
প্রতীকী ছবি

শাহ আলম ও হাতিম বাদশা:

দেশের সড়ক-মহাসড়কে উল্টোপথে যানবাহন চলাচল এখন এক ভয়াবহ নৈরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিনই অসংখ্য যানবাহন বিপরীত দিক থেকে চলাচল করছে। কয়েক মিনিট সময় বাঁচাতে কিংবা নির্ধারিত মোড় ও ইউ-টার্ন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উল্টোপথে চলাচলজনিত দুর্ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বেপরোয়া আচরণ শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি সরাসরি মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানোর শামিল।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, বগুড়া, রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই উল্টোপথে যানবাহন চলাচলের দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস এমনকি দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকও নিয়মিতভাবে উল্টোপথ ব্যবহার করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের বিভিন্ন অংশে উল্টোপথে চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকরা রাস্তার বিপরীত পাশে অবস্থিত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পেট্রোল পাম্প কিংবা বিশ্রামাগারে প্রবেশের জন্য হঠাৎ করেই উল্টোপথে প্রবেশ করছেন। আবার রাস্তার অপর পাশে থাকা খাবার হোটেল বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গাড়ি থামানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পার হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন মহাসড়কে দেখা গেছে, যাত্রাবিরতির জন্য নির্ধারিত হোটেলে প্রবেশ করতে গিয়ে অনেক বাস ও মাইক্রোবাস সরাসরি বিপরীত লেনে উঠে পড়ছে। এতে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডার কেটে অবৈধ প্রবেশপথ তৈরি করায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য এমন অনিয়মকে নীরবে উৎসাহিত করছে।

চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় উল্টোপথে চলাচলকে কেন্দ্র করে একাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ ঘটে ভুল লেনে প্রবেশ, হঠাৎ ইউ-টার্ন নেওয়া কিংবা রাস্তার অপর পাশে থাকা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের চেষ্টার কারণে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে এখন উল্টোপথে যানবাহন চালানোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় উল্টোপথে চলাচলকে ‘হাই রিস্ক ভায়োলেশন’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের গতি ও দূরত্ব সঠিকভাবে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত নজরদারি, অবৈধ ইউ-টার্ন, সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি এবং আইন প্রয়োগে শৈথিল্যও সমানভাবে দায়ী। অনেক স্থানে দিনের পর দিন উল্টোপথে যানবাহন চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে চালকদের মধ্যে শাস্তির ভয়ও কমে যাচ্ছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা দায়সারা বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। উল্টোপথে চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা নজরদারি, তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথগুলোও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

সড়ক বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; ধ্বংস করে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। কয়েক মিনিট সময় বাঁচানোর মানসিকতা যদি শত শত মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তবে সেই অনিয়মের দায় কেবল চালকের নয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই বহন করতে হবে। অন্যথায় উল্টোপথের এই মৃত্যুফাঁদ থেকে দেশের সড়ক-মহাসড়ককে মুক্ত করা সম্ভব হবে না।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়