বিশ্ব মান দিবসে বগুড়া ও রাজশাহীতে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ

Emphasis placed on ensuring product quality and eco-friendly fuel in Bogura and Rajshahi on World Standards Day.

বিশ্ব মান দিবসে বগুড়া ও রাজশাহীতে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ
ছবি- দৈনিক ক্রাইম ডায়রি

টুটুল হোসেন:

পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে বগুড়া ও রাজশাহীতে পালিত হয়েছে বিশ্ব মান দিবস-২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, সঠিক পরিমাপ পদ্ধতি অনুসরণ, পণ্যের মোড়কে প্রয়োজনীয় তথ্য নিশ্চিতকরণ এবং ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল—“A Shared Vision for a Better World: Affordable and Clean Energy”। বাংলায় যার ভাবানুবাদ, ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পণ্যের গুণগত মান শুধু একটি পণ্যের ব্যবহারযোগ্যতা বা স্থায়িত্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভোক্তার নিরাপত্তা, ক্রেতার আস্থা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা গেলে দেশীয় বাজারে ভোক্তার আস্থা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

তাঁরা বলেন, নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ভোক্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, পণ্যের গুণগত মান যাচাই এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

এ বছরের প্রতিপাদ্যের আলোকে আলোচনা সভায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বক্তারা।

তাঁরা বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, পরিবেশের সুরক্ষা এবং মানসম্মত প্রযুক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।

বক্তারা আরও বলেন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রযোজ্য সনদ গ্রহণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিএসটিআই থেকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হালাল সনদ গ্রহণের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পণ্যের গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্রযোজ্য মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সনদ গ্রহণ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা রপ্তানিকারকদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

তাঁদের মতে, দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশি বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ আরও সুগম হতে পারে।

ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা ও বাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় পণ্যের মোড়কে সঠিক তথ্য প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেট্রিক পদ্ধতির পরিমাপ ব্যবহার এবং পণ্যের মোড়কে নিট ওজন, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যথাযথভাবে উল্লেখ করার আহ্বান জানান।

তাঁরা বলেন, পণ্যের মোড়কে নির্ভুল তথ্য থাকলে ভোক্তা পণ্য কেনার আগে এর পরিমাণ, মূল্য ও ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং পরিমাপ ও মূল্যসংক্রান্ত বিভ্রান্তি কমানো সম্ভব হয়।

এ ছাড়া পণ্যে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের ‘বি’ (B) মার্ক চিহ্ন এবং কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে পণ্যের মান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, পণ্য কেনার সময় শুধু বাহ্যিক মোড়ক বা বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের প্রয়োজনীয় তথ্য, মূল্য, ওজন, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং প্রযোজ্য মানচিহ্ন যাচাই করা উচিত।

আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করা কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের একক দায়িত্ব নয়। উৎপাদককে পণ্যের মান বজায় রাখতে হবে, ব্যবসায়ীকে সঠিক তথ্য দিয়ে পণ্য বাজারজাত করতে হবে এবং ভোক্তাকেও পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি, মান যাচাই এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে তাঁরা বলেন, পণ্য ও সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি, নিরাপদ বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এবারের প্রতিপাদ্যে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ায় মানসম্মত প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

বগুড়া ও রাজশাহীতে বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির মূল প্রত্যাশা হলো—পণ্যের মান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল করা এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদার করা। সংশ্লিষ্ট সবার কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় হবে।

বিশ্ব মান দিবস-২০২৬-এর প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মানসম্মত পণ্য, সঠিক পরিমাপ, সচেতন ভোক্তা এবং সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সমন্বয়ে উন্নত, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জেলা