সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি হলে কঠোর ব্যবস্থা

কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুদ ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে কঠোর নজরদারির নির্দেশ

সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি হলে কঠোর ব্যবস্থা
ছবি- দৈনিক ক্রাইম ডায়রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর

কৃষকদের জন্য নির্ধারিত সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধভাবে মজুদ কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির মতো অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান। তিনি বলেছেন, কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রবিবার রংপুর অঞ্চলের সার ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কৃষি সচিব এসব কথা বলেন।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম এনডিসি। সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিমসহ কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার প্রধান এবং রংপুর বিভাগের সার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কৃষককে হয়রানি করলে ছাড় নয়

সভায় কৃষি সচিব বলেন, সার নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি করার সুযোগ দেওয়া হবে না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করার চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে সার গুদামজাত করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে কিংবা অবৈধভাবে মজুদ করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকের প্রয়োজনীয় সার প্রাপ্তির পথে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

কৃষি সচিব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, কৃষক যেন সার কিনতে গিয়ে অযথা ঘোরাঘুরি বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সার সরবরাহ, মজুদ এবং বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে।

‘দেশে সারের সংকট নেই’

বর্তমানে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে বলেও সভায় উল্লেখ করেন কৃষি সচিব। তিনি বলেন, কোথাও কোনো কৃষক সার না পাওয়ার অভিযোগ করলে সেটিকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি দ্রুত যাচাই করে কোথায় সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কার কারণে হচ্ছে—তা চিহ্নিত করতে হবে।

তার ভাষ্য, জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কৃষক সারসংকটে পড়লে সেটি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বা স্থানীয় কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত হতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু গুদামে সার মজুদ থাকলেই হবে না; প্রয়োজনের সময় সেটি যেন যথাযথভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে যায়, সেটিই মূল বিষয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও কর্মকর্তাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ

রংপুর অঞ্চলের সার ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দেন কৃষি সচিব। কৃষকের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সার বিতরণ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে তথ্য যাচাই ও তদারকি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, কৃষি কর্মকর্তাদের কাজ কেবল অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কৃষকের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে মাঠে যেতে হবে। কোথায় সার যাচ্ছে, কারা পাচ্ছেন এবং নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে কোনোভাবে সার বিক্রি বা মজুদ হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কৃষকদের সমস্যাকে দ্রুত শনাক্ত করে সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

রংপুর অঞ্চলের সার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা

মতবিনিময় সভায় রংপুর অঞ্চলে সারের সরবরাহ, বিভিন্ন পর্যায়ে মজুদের পরিমাণ, বিতরণ প্রক্রিয়া এবং কৃষকদের সারপ্রাপ্তির বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষকদের চাহিদার বিষয়গুলো কৃষি সচিবের সামনে তুলে ধরেন।

এ সময় সার ব্যবস্থাপনার কোথাও কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে কৃষি মৌসুমে যাতে চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো সার কৃষকের হাতে পৌঁছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলা হয়।

সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরেন।

ভার্মিকম্পোস্ট খামার পরিদর্শন

মতবিনিময় সভা শেষে কৃষি সচিব রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামের কৃষক অহিদুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি বেসড ভার্মিকম্পোস্ট খামার পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে তিনি খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন, ব্যবহার ও কৃষিকাজে এর সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে খোঁজ নেন। এ সময় কৃষকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে খামার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়েও অবহিত হন।

কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর গুরুত্ব নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

কৃষি খাতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সার সরবরাহের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফসলের মৌসুমে বাজারে সার নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ফসল উৎপাদনে পড়তে পারে। এ কারণে সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রতিরোধে মাঠ প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন কৃষি সচিব।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়মিত বাজার তদারকি, মজুদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন মৌসুমে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব হবে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়