নাব্যতা ও দূষণে সংকটে দেশের নদ-নদী: করতোয়া-বাঙালীসহ হারাচ্ছে প্রাণ
জাকির হোসেন রনি, আশিকুর রহমান মাহী , বগুড়া অফিসঃ
নাব্যতা সংকট, দখল ও দূষণের চাপে দেশের নদ-নদীগুলো দিন দিন হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণচাঞ্চল্য।
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী করতোয়া ও বাঙালী নদীর বর্তমান চিত্র সেই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।
একসময় জীবিকা, যোগাযোগ ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকা এই নদীগুলো এখন প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।
বগুড়ার শেরপুর ও সিরাজগন্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, করতোয়া ও বাঙালী নদীর অনেক অংশে পানির প্রবাহ কমে গিয়ে নদী সরু খালে পরিণত হয়েছে।
নদীর পাশ্ববর্তী বাজার এলাকা গুলোর সিংহভাগ বর্জ্য নদীতে গিয়ে মিশছে। অনেক জায়গা দখলদারদের কবলে।
কোথাও কোথাও শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়াও সম্ভব। স্থানীয়রা বলছেন, নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত দখলই এ অবস্থার মূল কারণ।
পাশ্ববর্তী বসবাসকারী জেলে সম্প্রদায়ের অনেকেই দৈনিক ক্রাইম ডায়রিকে জানান, একসময় নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। জেলেসহ স্থানীয় অনেক মানুষ মাছ হতেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।
এখন বছরের বেশিরভাগ সময় নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। এতে তাদের জীবিকা সংকটে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করতোয়া নদী প্রায় ১২৩ কিলোমিটার এবং বাঙালী নদী প্রায় ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। তবে দীর্ঘ এই পথজুড়ে এখন অনেক অংশেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শেরপুর পৌর এলাকার পয়োবর্জ্য সরাসরি করতোয়া নদীতে ফেলা হচ্ছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ ও ক্লিনিকের বর্জ্যও নদীতে মিশছে। এতে পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উত্তর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশুতোষ সরকার বলেন, “নদীর পানি এতটাই দূষিত হয়ে গেছে যে আগের মতো গোসল বা ব্যবহার করা যায় না। মাছও টিকে থাকতে পারছে না।”
শুধু করতোয়া ও বাঙালী নয়, দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো -
বুড়িগঙ্গা নদী: রাজধানী ঢাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত এই নদী দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের কারণে মারাত্মক দূষণের শিকার।
তুরাগ নদী: দখল ও দূষণের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকায়।
শীতলক্ষ্যা নদী: বিভিন্ন শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে পানির গুণগত মান হুমকির মুখে।
কর্ণফুলী নদী: চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ নদীও দূষণ ও নাব্যতা সংকটে ভুগছে।
মেঘনা নদী: দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী হলেও বিভিন্ন স্থানে ভাঙন, দূষণ ও পলি জমে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের প্রায় সব বড় নদীই এখন কমবেশি একই সমস্যার মুখোমুখি—দূষণ, দখল, নাব্যতা সংকট ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।
নদীর এই অবনতির কারণে শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় নৌপথে পণ্য পরিবহন সহজ ও কম খরচে সম্ভব হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে দেশীয় মাছের প্রজাতিও দ্রুত কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ইদানীংকালে শিল্প বর্জ্য ও নদী রক্ষা বিষয়ক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে করতোয়া ও ফুলজোর নদী তীরবর্তী এলাকা ঘুরে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে স্থানীয় এসআর কেমিক্যাল ও মজুমদার প্রোডাক্টস নামের দুটি প্রতিষ্ঠান তাদের বর্জ্য নদীতে ফেলছে। এ নিয়ে অনেক আন্দোলন, মানববন্ধন ও সেমিনার হচ্ছে। যদিও প্রতিষ্ঠান গুলো সঠিকভাবে ইটিপি করছে বলে দাবী করেছ । তবে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ হতে স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তীরবর্তী উপজেলাগুলোর সহকারী কমিশনার বৃন্দ (ভূমি) বলেন, “করতোয়া ও বাঙালী নদী নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিলে নদীগুলোকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
নদী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে—
নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করা শিল্পবর্জ্য শোধনাগার (ETP) নিশ্চিত করা ও পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন সবাই।
করতোয়া ও বাঙালী নদীর বর্তমান অবস্থা দেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই প্রতিফলন।
এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও অনেক নদী হারিয়ে যেতে পারে। নদী বাঁচাতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি / স্পেশাল










