বিআরটিএর নম্বরপ্লেট দুর্নীতি: দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা তথ্য

প্রতি মাসে এই বেআইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের অনুসন্ধানে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সংক্রান্ত এই দুর্নীতির নানা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।

বিআরটিএর নম্বরপ্লেট দুর্নীতি: দুদকের অনুসন্ধানে   উঠে এসেছে নানা তথ্য
ছবি: অনলাইন হতে সংগৃহীত

প্রতি মাসে এই বেআইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের অনুসন্ধানে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সংক্রান্ত এই দুর্নীতির নানা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।

হাতিম বাদশা:

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ডিজিটাল নম্বরপ্লেট নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। এই জটিলতার সুযোগ নিয়ে বিআরটিএর একটি অসাধু চক্র মিরপুর, উত্তরা, ইকুরিয়া ও পূর্বাচলসহ বিভিন্ন শাখা থেকে সারা দেশে নম্বরপ্লেট স্থানান্তরের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। প্রতি মাসে এই বেআইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের অনুসন্ধানে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সংক্রান্ত এই দুর্নীতির নানা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।
 

বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার তথ্য বলছে, বিআরটিএতে নিবন্ধিত কোনো গাড়ির কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে গেলে নিয়ম অনুযায়ী ফি দিতে হয় ৩ হাজার ৬৫২ হাজার টাকা। মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে ফি দিতে হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফি দিতে হয় ২ হাজার ২৬০ টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফি দিতে হয় ৫৫৫ টাকা।
 
দুদকের প্রতিবেদন বলছে, তারা কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে নির্ধারিত ফিসহ ৫ হাজার টাকা, মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৪ হাজার টাকা, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৩ হাজার টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফিসহ ২ হাজার টাকা আদায় করছেন।
 
বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা এভাবে লুটপাট হচ্ছে, সেই অঙ্কটি নির্ধারণ করা যায়নি। তবে দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির হোতারা প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন। 

দুর্নীতির মূল নায়ক আল আমিন
বিআরটিএর ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আল আমিনের নাম। ২০১২ সালে এনরোলমেন্ট অফিসার থেকে ম্যানেজার পদে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই তিনি নম্বরপ্লেট শাখাকে দুর্নীতির ঘাঁটিতে পরিণত করেন। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আল আমিনের বিরুদ্ধে একাধিকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তিনি প্রতি বারই মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে রেহাই পেয়েছেন। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, তিনি প্রতি মাসে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিআরটিএর কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ঘুষ হিসেবে প্রদান করেন।

এতেই শেষ নয়—আল আমিন তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট সদস্যদের সহায়তায় মিরপুর সার্কেলের এক ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদকে এনরোলমেন্ট এক্সিকিউটিভ পদে নামিয়ে আনেন। পরবর্তীতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে তানভীরকে গাজীপুর সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এরপর প্রতিষ্ঠানের একাধিক যোগ্য সহকারী ব্যবস্থাপককে উপেক্ষা করে আল আমিনকেই ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
 

অনুসন্ধানে জানা যায়, আল আমিন দুর্নীতি করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে অবস্থিত তার বর্তমান ফ্ল্যাটের মূল্য ৮০ লাখ টাকা। বগুড়ায় কোটি টাকার মশারির ব্যবসা আছে তার। ৬ লাখ টাকা দামের একটি গাড়ি আছে তার। এ ছাড়া আল আমিন এবং তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ আছে। 

‘আল আমিন সিন্ডিকেটে’ কারা আছেন
বিআরটিএর আলোচিত ‘আল আমিন সিন্ডিকেট’-এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মাকসুদুর রহমান, প্লাবন রোজারিও, ডমিনিক ফালিয়া ও ইশতিয়াক আহমেদ।

ডিজিটাল নম্বরপ্লেট তৈরির কারিগরি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান  টাইগার আইটি  এর একাধিক কর্মকর্তাও এই দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির নম্বরপ্লেট প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আহসান হাবীব, কারিগরি বিভাগের প্রধান রুহুল রনি, কারিগরি সহায়ক বেলাল হোসেন, হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী, প্রকল্প সমন্বয়ক মাসুদ সুজনের সহযোগী রক্সি এবং এইচ আল হুমায়রার নামও দুর্নীতির তালিকায় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া বিআরটিএর নম্বরপ্লেট প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিনকেও এই অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুদকের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিজিটাল নম্বরপ্লেট জালিয়াতিতে যুক্ত সবচেয়ে বড় নাম বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি শাখা) শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের। তিনি একা নন, এই নম্বরপ্লেট দুর্নীতির অর্থ লোপাটে নাম এসেছে ইকুরিয়া বিআরটিএ শাখার ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, পূর্বাচল বিআরটিএ সেকশনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, আমজাদ হোসেন রুবেল এবং ফিক্সিং অপারেটর ইব্রাহীমের। বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখরের আপন ভায়রা। মেহেদী হাসান শীতাংশু শেখরের ড্রাইভার জসিম উদ্দিনের আপন ভাই। আল আমিন সিন্ডিকেটকে সহায়তা দিতে শীতাংশু শেখরের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।
 
এর আগে বিআরটিএর ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রমে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। ২০১২ সাল থেকে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটি যুক্ত হয়। পরে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিআরটিএ। কিন্তু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন ভেহিক্যাল নম্বরপ্লেটে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে টাইগার আইটির চুক্তি এখনো বাতিল হয়নি।
 
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করে।
 
এমন ঘটনার পরেও বিআরটিএ কেন টাইগার আইটির কারিগরি সহায়তা নিচ্ছে, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।
আল আমিনের প্রধান সহযোগী বিআরটিএর কর্মকর্তা ইশতিহাক আহমেদ। তিনি বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (এডি) এবং পরিদর্শকদের স্বাক্ষর-সিল নকল করেন। পরে সেই সিল-সাইন ব্যবহার করে ভুয়া নম্বরপ্লেট তৈরি করেন। প্লাবন রোজারিও সব নম্বরপ্লেট হস্তান্তরের হিসাব সংরক্ষণ করেন। ডমিনিক ফালিয়া ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হস্তান্তর বাবদ যত টাকা আয় হয়, তার হিসাব রাখেন। মাকসুদুর রহমান বায়োমেট্রিক থেকে যা আয় হয় তার হিসাব রাখেন।
 
বিআরটিএর চারটি কার্যালয় থেকে সারা দেশে নম্বরপ্লেট পাঠানো হয়। এরপর নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয় তার হিসাব-নিকাশ করেন এই কর্মকর্তারা। প্রত্যেকের লাভের অংশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হয়। নিজেদের ভাগের টাকা রেখে তারা বড় অঙ্কের অর্থ পাঠিয়ে দেন আল আমিনের কাছে।
 
আল আমিনের হয়ে এই অর্থ বিলি-বণ্টন করেন টাইগার আইটির হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী। বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে মাস শেষে কত টাকা উঠল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখেন তিনি।
আক্কাস আলীর দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি বিআরটিএর মিরপুর সার্কেলের নম্বরপ্লেট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিনকে উত্তরা সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এই বদলি করানোর জন্য তিনি বিআরটিএর তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক শীতাংশু শেখরকে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দেন বলে বিআরটিএর নানা সূত্রে জানা গেছে।
 
নম্বরপ্লেট দুর্নীতির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিআরটিএর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে খবরের কাগজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। এই কর্মকর্তাদের একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি। শীতাংশু শেখরকে তার কার্যালয়ে গিয়েও পাওয়া যায়নি।
 
পরে এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ মো. সাদ উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুদক থেকে এখনো কোনো চিঠি আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি। আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। বিআরটিএর নানা দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছি। সব অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// ক্রাইম