কাগজে-কলমে নিঃস্ব প্রকৌশলী, কিন্তু স্ত্রী-সন্তানের নামে কোটি টাকার সম্পদ

কাগজে-কলমে নিঃস্ব প্রকৌশলী, কিন্তু স্ত্রী-সন্তানের নামে কোটি টাকার সম্পদ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

জুয়েল মাঝি, বরিশাল বিভাগীয় অফিসঃ
হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এক নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব প্রায় শূন্য।

নথিপত্র অনুযায়ী তিনি যেন প্রায় নিঃস্ব। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তার নিজের নামে বড় কোনো সম্পদের খোঁজ মেলেনি।
কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। তার পরিবারে যেন টাকার প্রবাহ থেমে নেই। গৃহিণী স্ত্রীর নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে, আর কলেজপড়ুয়া দুই ছেলের ব্যাংক হিসাবেও জমা আছে কোটি টাকার সম্পদ।
এই চিত্র সামনে এসেছে পিরোজপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাময়িক বরখাস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদারকে ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে।

তদন্তে তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজের পরিবারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এলজিইডির বিভিন্ন ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে এই অর্থ আত্মসাত করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার এ অনিয়মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
দুদকের অনুসন্ধান শেষে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মহারাজ পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আটটি মামলারও আসামি তিনি।
তবে তদন্তের শুরুতে দুদকের কর্মকর্তারা কিছুটা বিস্মিত হন। কারণ, প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের নিজের নামে উল্লেখযোগ্য অবৈধ সম্পদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কিন্তু তার স্ত্রী ও দুই ছেলের নামে পাওয়া গেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।

দুদকের দাবি, এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া কাজ দেখানো এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাত করা হয়। পরে সেই অর্থের উৎস গোপন রাখতে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়।
বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেন সংস্থাটির উপসহকারী পরিচালক পার্থ চন্দ্র পাল।

মামলায় আসামি করা হয়েছে আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, তার স্ত্রী রীনা পারভীন এবং দুই ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনকে।
তদন্তে জানা গেছে, রীনা পারভীন একজন গৃহিণী এবং তার নিজস্ব কোনো পেশা বা আয়ের উৎস নেই। তবুও তার নামে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালীর আরামবাগ এলাকায় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তার নামে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার পান্থপথে একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে প্রায় ৪৭ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে প্রায় ১,৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট।
এছাড়া পশ্চিম আগারগাঁওয়ের একটি আবাসন প্রকল্পে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রায় দুই কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্যও মিলেছে। সব মিলিয়ে জমি, ফ্ল্যাট ও ভবনসহ তার নামে প্রায় চার কোটি ৩৮ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের হিসাব পাওয়া গেছে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকে সঞ্চয়, গাড়ি কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগসহ আরও প্রায় এক কোটি ৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্যও রয়েছে।
দুদকের হিসাবে, রীনা পারভীনের গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে প্রায় পাঁচ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।
ছাত্র হয়েও কোটি টাকার সম্পদ
তদন্তে প্রকৌশলীর দুই ছেলের সম্পদের তথ্যও সামনে এসেছে। মামলার নথি অনুযায়ী, সম্পদ অর্জনের সময় দুজনই ছিলেন শিক্ষার্থী এবং তাদের কোনো স্বতন্ত্র আয়ের উৎস ছিল না।
তবুও বড় ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাতের নামে প্রায় ১২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং ছোট ছেলে ফজলে রাব্বি রিমনের নামে প্রায় ১২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রিফাতের নামে প্রায় ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং রিমনের নামে প্রায় ৭৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার সম্পদের হিসাব মিলেছে। সব মিলিয়ে দুই ছেলের নামে প্রায় দুই কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
দুদকের অভিযোগ, অবৈধ অর্থের উৎস আড়াল করতে রিফাতের নামে প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা এবং রিমনের নামে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এমনকি তাদের নামে আয়কর নথিও খোলা হয়েছে, যদিও বাস্তবে কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।
সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব স্থগিত
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিরোজপুরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত ইতোমধ্যে আসামিদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
দুদকের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তদন্ত শুরু হলে আরও নতুন তথ্য ও সম্পদের হিসাব সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজের নামে বড় সম্পদের তথ্য না মিললেও পরিবারের সদস্যদের নামে পাওয়া বিপুল সম্পদের হিসাব এখন দুদকের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। এই তদন্ত থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে দুর্নীতির আরও বিস্তৃত চিত্র।

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি // ক্রাইম