মিরপুর ট্রাজেডিঃ আগুনে কত জীবন ঝড়লে কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে
পরিবেশ ও ফায়ার দায় এড়াতে পারেনা। জনবসতির মধ্যে কেমিক্যাল গোডাউন এবং গার্মেন্টস গুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক এবং ইমার্জেন্সি এক্সিট না থাকা স্বত্বেও কিভাবে অনুমতি পায় এরা তা খতিয়ে দেখে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দূর্ঘটনার পরিমান কমে আসবে।
পরিবেশ ও ফায়ার দায় এড়াতে পারেনা। জনবসতির মধ্যে কেমিক্যাল গোডাউন এবং গার্মেন্টস গুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক এবং ইমার্জেন্সি এক্সিট না থাকা স্বত্বেও কিভাবে অনুমতি পায় এরা তা খতিয়ে দেখে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দূর্ঘটনার পরিমান কমে আসবে।
শাহাদাত হোসেন রিটনঃ
বছরে কত জীবনের সমাপ্তি ঘটে আগুনে তার কোন সঠিক হিসাব কর্তৃপক্ষ রাখেন কি? আর কত প্রাণ ঝড়লে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে উঠবে?
প্রতিনিয়ত আগুন লাগছে আর জীবন ঝড়ছে। ঘন বসতির মধ্যে কিভাবে কেমিক্যাল কারখানার অনুমোদন হয়। আর ঘিন্জি এলাকার চিপা বিল্ডিংয়ে কিভাবে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী হয়। কারা এগুলোর অনুমোদন দেয়। ফায়ার ইকুইপমেন্ট এবং ইমার্জেন্সি এক্সিট না থাকা স্বত্বেও এরা কিভাবে ফ্যাক্টীরী অনুমোদন পেল আর সুবিধা নিয়ে অনুমোদন দিল তা খতিয়ে দেখতে হবে।
যারা এই বিষয়ে ছাড় দিবে তারাও এসব গণহত্যার দায় এড়াতে পারেনা।
আমরা আটকে গেছি, বের হতে পারছি না’, বাবার সঙ্গে শেষ কথা ছিল আলো নামে একজন গার্মেন্টস কর্মীর।
‘কারখানায় আগুন লেগেছে। আমরা আটকে গেছি, বের হতে পারছি না’—মোবাইল ফোনে বাবাকে শেষ এই কথা বলেছিলেন মার্জিয়া সুলতানা আলো (১৮)। এরপরও প্রায় ১০ মিনিট কল বেজেছিল, তবে কেউ সাড়া দেয়নি। এরপর থেকে আলোর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গত ১ অক্টোবর রাজধানীর রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় ‘আরিয়ান ফ্যাশন’ গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিলেন আলো ও তার স্বামী মো. জয় (২২)।
আলোর মা ইয়াসমিন বেগম গণমাধ্যমকে জানান, তাদের বাড়ি নেত্রকোণার মদন উপজেলায়। তারা থাকেন পোশাক কারখানা থেকে ৩০০ গজ দূরে রূপনগর আবাসিক এলাকার ১২ নম্বর সড়কের মজিবরের বস্তিতে।
গত ঈদুল আজহার দুই দিন পর আলোর সঙ্গে তার চাচাতো ভাই জয়ের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।
ইয়াসমিন বলেন, জয় আগে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতো। বিয়ের পর এই গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিল। জয় অপারেটর আর আলো হেলপার হিসেবে একই ফ্লোরে কাজ করতো।
আলো এবং জয় বস্তিতে তাদের পাশেই একটি টিনশেড ঘরে থাকতো জানিয়ে ইয়াসমিন বলেন, আমাদের বস্তি থেকে গার্মেন্টস দেখা যায়। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। তারপর শুনলাম কারখানায় আগুন লেগেছে।
মেয়ে ও জামাতার ছবি হাতে আলোর বাবা মো. সুলতানও ঘটনাস্থলে এসেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আগুন লাগার খবর শোনার পরই আলোকে ফোন করলাম। রিসিভ করল। বললো, কারখানায় আগুন লেগেছে। আমরা আটকে গেছি, বের হতে পারছি না। আমি সাহস দিলাম। বললাম, অন্য সবাই যেভাবে বের হচ্ছে, তোমরাও সেভাবে বের হও। এরপরও প্রায় ১০ মিনিট ফোনে কল বেজেছিল। আমার মেয়ে আর রিসিভ করে না। এরপর ফোন বন্ধ। মেয়ে-জামাই কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা ‘আরিয়ান ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক কারখানা এবং তার পাশে থাকা টিনশেড ঘরে কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে যায়। ঘটনাস্থল থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, ধারণা করা হচ্ছে টিনশেড একতলা কেমিক্যাল গোডাউনে প্রথম আগুন লাগে। সেই আগুন বিপরীত দিকে থাকা পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।
ছেলের খোঁজে ঘটনাস্থলে এসেছেন জয়ের মা শিউলী বেগম।
কাঁদতে কাঁদতে শিউলী বলেন, একটু ভালো থাকার আশায় আমার ছেলে এই গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিল। এখন ছেলে, ছেলের বউ কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।
জয়-আলোর পাশের ঘরে থাকতেন মুন্নী আক্তার (১৬)। তিনিও অপারেটরের হেলপার হিসেবে একই ফ্লোরে কাজ করতেন।
মুন্নীর স্বামী মো. নাঈমকে এদিক-ওদিক ছুটতে দেখা যায়। ছেলের বউয়ের সন্ধানে ছবি হাতে ঘটনাস্থলে এসেছেন মুন্নীর শাশুড়ি তাহেরা বেগম।
তিনি বলেন, সকালে নাশতা খেয়ে মুন্নী কাজে এসেছিল। তারপর শুনলাম আগুন লেগেছে।
ছয় মাসে আগে নাঈমের সঙ্গে মুন্নীর বিয়ে হয়।
তাহেরা বলেন, সংসারে খুব অভাব। নাঈম মিষ্টির দোকানে কাজ করে যা পায়, তাতে সংসার চলে না। মুন্নী তাই সাড়ে সাত হাজার টাকায় গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিল।
এদিন রাত সোয়া ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে ময়নাতদন্তের জন্য ১৬ জনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নেওয়া হয়।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনেও স্বজনের খোঁজে অনেককে ভিড় করতে দেখা যায়। মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে কিন্তু এ মিছিল থামানোর কোন চেষ্টা হচ্ছে না। আর কোন অবহেলা নয়। দ্রুত লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবী বলে মন্তব্য করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি // রাজধানী










