ফিরে না পাওয়া ঘর
ডা. চন্দ্রগুপ্ত
পর্যন্ত শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল বিমান। দীর্ঘ নয় বছর ধরে উপার্জনের কতকটা হয়তো চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে । কিন্তু মহিদুলের ক্রমাগত এই চাপ ও আর নিতে পারছে না।
নয় বছর আগে একটা হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি করার জন্য যৌথ ব্যবসার দিকে এগিয়ে ছিল ওর সহপাঠী মহিদুল। ধনী বাবার ছেলে মহিদুল যেদিন প্রস্তাবটা প্রথমে বিমানকে দিয়েছিল, সেদিন উত্তরে বিমান বলেছিল,
- তোদের মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। যৌথ ব্যবসা করব কি করে !
প্রায় গলা জড়িয়ে ধরে মহিদুল বলেছিল,
- আরে, ব্যবসা কি শুধু অর্থ দিয়ে হয় ! আমার আছে অর্থ, আর ব্যবসাটা তুই দেখবি। তাহলেই তো যৌথ হয়ে গেল।-------ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুষ্টিয়ায় প্রথমদিকে ব্যবসা শুরু করেছিল।
বিমানের কাছে সেই দিনগুলিতে মহিদুলকে দেবদূত মনে হত।
ধীরে ধীরে বিমান বিয়েও করলো। শুধুমাত্র বিমানের ব্যবসা দেখে আলেয়ার বাবা এক কথায় বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। অত্যন্ত ধনী পরিবারের তৃতীয় কন্যা আলেয়া। সেই দিনগুলিতে কক্সবাজার অঞ্চলে ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতে দেখে অনেকের মনেই ঈর্ষা তৈরি হয়েছিল। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের এই যৌথ উদ্যোগ একেবারে বিনা বাধায় চলেছিল প্রায় বছর আট।
পাথর ভাঙ্গার যে বড় মেশিন তৈরি হতো তার সমস্ত বরাত ওদের কোম্পানির পেত । আর এটা করতে গিয়ে হাবিব মিয়ার সাথে একটু বেশি আন্তরিকতা জড়িয়ে পড়েছিল বিমান। যার ফলশ্রুতি প্রায় আড়াই কোটি টাকা বাকি । যেটা বাড়তে বাড়তে প্রায় সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছেছিল। যদিও এই পুরো টাকার মধ্যে সম্পূর্ণটাই মূলধন ছিল না । তবুও মহিদুলের সন্দেহ বাড়তে থাকল যে ব্যবসার টাকা নয়ছয় করছে বিমান।
বাড়িতে সেদিন দাড়ি কাটছিল বিমান। হাবিব মিয়াঁ ক্রাশারে ফোন করে ওকে ওর বাড়িতে আসতে বলেছিল । যাতে নিজেদের মধ্যে একান্তে আলোচনা করে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা যায়। ইতিমধ্যে বাড়ি বন্ধক দিয়ে ব্যাংক থেকে দেড় কোটি টাকা ধার নিয়ে কিছু টাকা শোধও করেছে।
কিন্তু মহিদুল চাইছে পুরো সাড়ে তিন কোটি টাকা ওকে ফেরত দিতে হবে। বিমান পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলেছে অনেকবার। কিন্তু মহিদুল কোন কথা শুনতে নারাজ । ওদের আলোচনায় নরম কথা, একটু উত্তপ্ত কথা, তারপরে প্রায় হাতাহাতির সম্পর্কে এগিয়ে গিয়েছিল এই দুই স্কুলের সহপাঠী।
এবার ধান জমি বন্ধক দিয়ে আরও এক কোটির ধার শোধ করার চিন্তা-ভাবনা করতে আলেয়া বিমানকে চেপে ধরলো ।
- তুমি কি ভাবছ, মেয়েটা ছয় আর ছেলেটা এক বছর হইল। সবাইরে একেবারে জলে ভাসাইয়া দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করলা তুমি?
-তুমি কেন বুঝতে পারতাছ না, এই টাকা শোধ করতে না পারলে মইদুল আমাগো সবাইরে শেষ কইরা ফেলাইবো। প্রাণে মাইরা ফেলাইবো দিবো কইয়া হুঁশিয়ারি দিসে।
-বিষয়টা তুমি হাবিব মিয়ারে ক্যান কওনা আমি তো এটাই বুঝিনা------
এক রাশ রাগ আর বিরক্তি মিশিয়ে আলেয়া চিৎকার করে উঠলো।
বাস্তবে বিমানের কাছে এই ধান জমি বন্ধক দেওয়া ছাড়া যে কোনো উপায় নেই, সে কথা আলেয়া বুঝতে চাইছে না। সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় এই মুহূর্তে বিমানের গা গুলিয়ে উঠছে । ওক্ পাড়তে পাড়তে দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলল।
২. দক্ষিণ ২৪ পরগনার নিউ গড়িয়া রেল স্টেশনের প্রায় গা ঘেঁষে একটা ছোট্ট বাজার গড়ে উঠেছে। শহর কলকাতায় বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত মানুষের ভিড় বাড়তে বাড়তে এখন গড়িয়া- সোনারপুর-বারুইপুর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত: এই সমস্ত মানুষদের জন্যই এই দোকানগুলো । সেখানে ছোট্ট একটি দোকান বানিয়েছে বিমান । সেটাও প্রায় তিন বছর হতে চললো। এখানে ও রেডিমেট পোশাক হাওড়া হাট থেকে এনে বিক্রি করে।
বাংলাদেশ থেকে প্রথমে নিজে প্লেনে করে চলে আসে কলকাতায়। শহরের কাছে একটা বাড়ি ভাড়া করে সুভাসগ্রাম অঞ্চলে। মাসখানেকের মধ্যে আলেয়াও দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে পৌঁছে যায় ।বাংলাদেশ থেকে আসার সময় প্রতিবেশীদের বলে এসেছিল, ইন্ডিয়াতে ঘুরতে যাচ্ছি। আসলে ওরা দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিল, সালটা ছিল ২০১৬ ।
ভারতে আসার আগে বিমান জেনেছিল, স্থানীয় থানায় অর্থ তছরুপের একটা অভিযোগ মহিদুল দায়ের করেছে। তাই পরিবার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসাই ছিল ওর একমাত্র উপায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেও ওকে পিছু ছাড়েনি। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চিকিৎসা করতে আসা মানুষগুলো মুখে মুখে খবর পৌঁছে দিয়েছিল মহিদুলকে।
দিনের পর দিন বাংলাদেশ থেকে মানুষজন এসে ওই গড়িয়া স্টেশনের গুমটির দোকানটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে যেত। ২০১৭ সালের শেষের দিকে বিমান বাধ্য হল দোকানটা ছেড়ে দিতে।
সুভাষগ্রাম স্টেশনের পাশে যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডার এর পাশে দু'কামরার একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছিল বিমান।
এতদিন দোকানে সামান্য বেচাকেনাতে ওর সংসার চলছিল। এখন সে পথ বন্ধ। তাই একদিন রাতে আলেয়া একটা প্রস্তাব দিল।
- পাশের বাড়ির খুকুদি কইছিল, ওর এক আত্মীয়ের ভেলোরে চিকিৎসা হইতাসে। লগে যাওয়ার জন্য একজন লোক দরকার। যাতায়াত ভাড়া, থাকা-খাওয়া ছাড়া হাতে কিছু টাকাও দিবো। তুমি তো বইসা আছো একবার চেষ্টা কইরা দেখনা। যদি এভাবেও কিছু উপার্জন করা যায় !
কথাটা মনে ধরল বিমানের। কাজটা তো খারাপ নয়, একজন অসুস্থ মানুষের সঙ্গে থাকা শুধু ভেলোরে গিয়ে। ডাক্তারের সাথে দেখা করতে যাওয়ার, সময়-অসময়ে সঙ্গে যাওয়া------- এইতো কাজ, মন্দ কি। অতএব ভারতের উপার্জনে একটা সোজাসাপ্টা দিক তৈরি হল বিমানের।
কাজ শুরু করতে গিয়ে জানলো, অনেক যুবক ছেলে আজকাল এই কাজটা করে থাকে। ১০ দিনের একটা ট্যুরে প্রায় নয় হাজার টাকা হাতে পাওয়া যায়। খুশি হয়ে দু-পাঁচশ টাকা এমনিও দিয়ে দেয়।
ততদিনে স্থানীয় স্কুলের মেয়েটিকে ভর্তি করেছে। নিজেদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড সব ই তৈরি হয়েছে। ভারতীয় পাসপোর্টও বানিয়ে নিয়েছে বিমান। যদিও সেটা নিজের দ্বারা সম্ভব হয়নি । অলক নামে বাংলাদেশ একটি ছেলে ওপার থেকে এখানে বারাসাত চাঁপাডালি মোড়ের কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। ওর কাজ হল নকল পাসপোর্ট আধার কার্ড এইসব করে তৈরি করে দেওয়া। আলোক ই পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছে।
অন্যান্য সবার থেকে এইসব তৈরি করতে প্রায় দু'লক্ষ টাকা নেয়। পুরনো একটা পরিচয়ের সূত্র ধরে ওর থেকে নিয়েছে মাত্র সত্তর হাজার টাকা।
কিন্তু শুধুমাত্র এই মেডিকেল কুরিয়ার হয়ে জীবিকা নির্বাহ না করে হঠাৎ করে বিমানের মনে হল ব্যাংকক থেকে জামা-কাপড় এনে এখানে বিক্রি করলে ব্যাপারটা অনেক লাভদায়ক হবে। বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেছিল জমির দালাল আদিত্য প্রসাদে সঙ্গে।
আর তারপরই আলিয়ার বেশ কিছু সোনার গয়না বিক্রি করে দমদম এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেয় বিমান। বাংলাদেশে থাকার সময় ব্যবসার কাজে আগে একবার গিয়েছিল। তখন মহিদুল এর সাথে ব্যবসা চলছে। নতুন করে জীবন শুরু করার তীব্র বাসনা, আত্মীয় পরিজন ছেড়ে অন্য দেশে এসে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে এ যেন এক মরিয়া চেষ্টা বিমানের।
ভবিষ্যতের সুখ ও কল্পনার ফানুসে ভেসে বিমান বন্দরের ভেতরে চেক-ইন করার জন্য ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালো বিমান। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাত। বিপত্তি তখনই শুরু হল। ফটো স্ক্যানার মেশিন সামনে দাঁড়াতেই নেতাজি সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসাররা আটকে দিল বিমানকে।
-এই পাসপোর্ট টা কিভাবে বানালেন আপনি?
ইমিগ্রেশন কাউন্টারে এই প্রশ্ন বিমানে সারা শরীরে একটা শীতল স্রোত এনেছিল । মুহূর্তে বাকরুদ্ধ বিমান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-স্যার, পাসপোর্ট দরখাস্ত করেই আমি বানিয়েছি।
-সেটা ঠিক কথাই। কিন্তু ছিলেন বিমান ভট্টাচার্যী হয়ে গেলে বিমান চক্রবর্তী, এটা কি করে করলেন?
-আমি তো স্যার বিমান চক্রবর্তী , ভট্টাচার্যী কি করে বলছেন?
ইমিগ্রেশন অফিসারের এবারের কথায় বিমান যেন অথৈ জল পড়ে গেল। শরীরের সমস্ত অনুভুতিগুলো শূন্যতে পরিণত হতে শুরু করল।
-আপনার বাংলাদেশের পাসপোর্ট বলছে আপনি এদেশে শেষবারের মত এসেছিলেন ২০১৭ সালে। সেখানে আপনার নাম ছিল বিমান ভট্টাচার্যী।----
এই মুহূর্তে মেরুদন্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত মাথা থেকে নেমে আসছে কোমরের দিকে। দুর্দান্ত টেকনোলজির সাহায্যে ইমিগ্রেশন বিভাগ জেনে গিয়েছে আসলে বিমান একজন বাংলাদেশী।
নতুন করে জীবন যাপনের যে স্বপ্ন নিয়ে ব্যাংকক যাওয়ার চিন্তাভাবনা করেছিল বিমান তাসের ঘরের মতো মুহূর্তে যেন সেটা ভেঙে পড়ল। আমতা আমতা করে কিছু বোঝাতে গিয়েও আর বোঝাতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্ত না ওই ইমিগ্রেশন অফিসার আবার কথা শুরু করলো।
- আপনার পাসপোর্টটা এখানে জমা থাকলো। এক সপ্তাহ পরে রিজনাল পাসপোর্ট অফিস থেকে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে নেবেন। ভুয়া পাসপোর্ট এর অভিযোগে আপনাকে আমরা গ্রেফতার করব না। আপনি ভালো মানুষ, তাই আপনাকে ফিরে যেতে বলছি।
কাঁধে ঝুলতে থাকা ব্যাগটা নিয়ে ধীর পায়ে বিমান বেরিয়ে এলো নেতাজি সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। বাইরের সার দিয়ে থাকা স্টিলের ট্রলিগুলো যেন ওর দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছে। সামনের ফাঁকা রাস্তায় দুরে কয়েকটা ট্যাক্সি যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই রাত বারোটার সময় গড়িয়া যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে না। তাই সার দিয়ে দাঁড় করানো ট্রলিগুলোর উপরে হতোদ্যম হয়ে বসে পড়লো বিমান।
৩. রাতে একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আলিয়া আর বিমান। অন্য ঘরে দুই ছেলেমেয়ে শুয়ে আছে গভীর ঘুমে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই জেগে, কিন্তু কারোর কোন কথা বের হচ্ছে না মুখ থেকে। আর বলার মতো কিছু নেই।
গতকাল ভারত সরকারের ইমিগ্রেশন দপ্তর থেকে তদন্ত করতে এক অফিসার এসে হাজির হয়েছিল এই ভাড়া বাড়িতে। বিমান অনেক ভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিল যে তারা ১৯৯১ সালে ভারতে এসেছে। সেই অফিসার নিজের ধর্মের লোক বলে বিমান অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে তার দেশে অন্য ধর্মের মানুষের অত্যাচারের ফলে সে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। বলা যায়, ধর্মীয় অনুভূতিটাকে একটু উসকে দিয়ে যদি কোন সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু ভদ্রলোক সে সব কথার মধ্যে না দিয়ে একের পর এক ওর যাবতীয় দলিল অর্থাৎ ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড এই গুলো দেখে নিলেন। পটাপট ছোট্ট একটি ক্যামেরায় তার ছবিও তুলে নিলেন।
তারপরেই তার প্রশ্ন,
- এইসব দলিল পেতে গেলে যেসব প্রমাণপত্র জরুরি সেগুলো তার কাছে না থাকা সত্ত্বেও বিমান কিভাবে এই দলিল গুলো পেল?
শুরুতে বিমান বিষয়গুলোকে অন্যভাবে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করলেও ক্রমাগত মনের উপর চাপ বাড়তে থাকে। সামনে রাখা জগের জল ততক্ষণে বারে বারে খেয়েও প্রায় শেষ করে ফেলেছে।
অফিসার প্রশ্ন করলেন,
- খুব বেশি টেনশন হচ্ছে তাই না? এবার মানে মানে সত্যি কথা গুলোই বলে ফেলুন। নইলে বর্ডারের এপারে দাড় করিয়ে এক ধাক্কায় ওপারে সপরিবারে পাঠিয়ে দেবো।
সারা শরীর ঝিমঝিম করে উঠল বিমানের। ওর ছোট ছেলেটা ততক্ষণে স্কুল থেকে বাড়ি চলে এসেছে। কদিন থেকেই যে একটা থমথমে পরিবেশ সারা বাড়ি জুড়ে কিছুটা যে বুঝতে পারছিল না তা নয়। তবে এটা বুঝে গেছে আরো একবার ওদের বাসা বদল করতে হবে। অফিসার যতক্ষণ বিমানের বাড়িতে ছিলেন, আলেয়া ও মেয়ে সেই সময়ে পাশের ঘরেই ছিল।
অফিসার জল খাওয়ানোর অসিলায় বিমান পাশের ঘরে গিয়ে আলেয়াকে ডেকে নিয়ে আসল। আলেয়া খাবার জল গ্লাসে করে এনে দাঁড়াতেই বিমান বলল,
- স্যার, ইনি আমার স্ত্রী। বড় বিপদে পড়ে গেলাম আমরা।
বিমানের কথার খেই ধরে আলিয়া বলল,
- আপনি আমার বড় ভাই। আপনার হাতেই আমাদের জীবন মরণ। কিছু একটা করুন যাতে এই ছোট বাচ্চাগুলোকে নিয়ে জীবনটা শান্তিতে কাটে।
তদন্তকারী অফিসার এসব কথার উত্তর না দিয়ে সোজাসুজি বিমানকে বলল,
- আপনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কেসের ব্যাপার যা আছে তার সম্বন্ধে বলুন।
যদিও কেস-কামারির বিষয়টা ওনার জানা ছিল না। শুধুমাত্র আন্দাজের ভিত্তিতেই বিমানকে একটু বাজিয়ে দেখতে চাইলেন।
বিমানের মনে হল কেস সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য ভারত সরকারের কাছে এসে গেছে। তাই বাঁচার উপায় নেই দেখে একের পর এক যাবতীয় অতীত তুলে ধরলো সেই অফিসারের সামনে। যাবার সময় মিনমিনে স্বরে বলল,
- স্যার আমি আমার সর্বস্ব দিতে রাজি আছি। শুধু আমাকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিন।
অফিসার আর কোন কথা না বলে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে এক তলায় নেমে এলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,
- পয়সাকড়ি কথা আমাকে বলেছেন। অন্য কাউকে বললে তারা আপনার থেকে পয়সাটা নেবে। কিন্তু আপনার কোন কাজ তারা করতে পারবে না। এখন আসছি, তবে বাসা পরিবর্তন করা বা অন্য কোথাও পালিয়ে গেলে বিপদে আপনি পড়বেন। তাই যদি কোথাও বাসা বদল করেন, আমাকে জানিয়ে দেবেন।
৪. ব্যাংকক যাওয়া ভণ্ডুল হয়ে যাবার পর বিমান ঠিক করেছিল পাসপোর্ট যখন জমা পড়ে গেছে, সেটাকে কোনমতে ছাড়িয়ে এনে নেপাল হয়ে ব্যাংকক যাবে। কিন্তু অফিসারের সঙ্গে কথাবার্তার পরে ওর মনে হয়েছে ওই পাসপোর্ট আনতে গেলে আরো গভীর বিপদে পড়বে। তাই নেপাল হয়ে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে দূরে সরিয়ে দিল।
এদিকে হাতে টাকা-পয়সাও শেষের দিকে। নতুন করে দু-একজন কেরালাতে চিকিৎসা করতে যাবে। তাদের এসকর্ট পার্টি হওয়ার জন্য বারবার করে বলছে। কিন্তু একটা ভয় পেয়ে বসেছে, ওর অবর্তমানে যদি পুলিশ এসে ওর পরিবারের সবাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাহলে তো সব হারাবে। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। বড় হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসে ভিটে ছাড়া হয়েছে। যদি এবার পরিবার ছেড়ে চিরকালের মত হারিয়ে যেতে হয় তাহলে সেটা ওর কাছে আত্মহত্যার শামিল হবে।
এসব চিন্তা ভাবনার মাঝখানে বারাসতে পুরানো দালালের সঙ্গে একবার ফোনে কথা বলে ওর সাথে আলোচনা করে ঠিক করলো, যদি বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে চলে যাওয়া যায়। সবই ঠিক ছিল। প্রথমে বউ ছেলেমেয়ে তিনজনেই যাবে। তারপরে নিজে যাবে। প্রথমে বউ ছেলেমেয়েকে বারাসাত থেকে বর্ডার পার করিয়ে দেবে। কিন্তু বারাসাত গিয়ে অন্য গল্প শুনছে।
আগে যেভাবে বর্ডার পার হতো, এখন নিয়মটা পাল্টে গেছে। এখন বাঁশের এক রকম ক্রেন তৈরি করে যেভাবে বস্তায় মালপত্র পাচার হয়, সেভাবে মানুষকে বেঁধে বেঁধে এপার থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার জন্য হাতে সময় থাকে মাত্র ৩০ মিনিট। ৩০ মিনিটের মধ্যে পার হতে না পারলে বিএসএফের গুলি খেয়ে মরতে হবে। আবার দেশে ফিরে গেলে মহিদুল চেপে ধরবে। তাই এখনো ইন্ডিয়াই সঠিক ঠিকানা বলে মনে হচ্ছে।
নতুন ঘর ভাড়া নিয়ে বসে গেল বিমান বারাসাতে। বারাসাত এসপি অফিস ছাড়িয়ে ময়নার হাটে ছোট্ট একটা সবজি দোকান করল। হাতে যে টাকা পয়সা ছিল তাই দিয়ে দিন কতক চলল।
দিন কয়েকের মধ্যে আবার অশনি সংকেত। পকেটে থাকা মোবাইলটা বাজছে। মোবাইলটা অন করে কাঁপতে থাকলো বিমল। নামটা সেভ করা ছিল। সেই অফিসার ফোন করেছে।
- সুভাষগ্রামের বাড়ি এসে আরেকবার যেতে চাই।
বিমান বলল যে তারা বাড়ি পরিবর্তন করে এখন বারাসাতে আছে। তবে ঠিকানাটা সে জানে না। তার পরই ফোনটা কেটে দিয়ে দু'হাত মুখে চেপে সবজি দোকানের সামনে বসে পড়লো। পরিচিত গলার আওয়াজে মুখ তুলল-----
- কিরে হালা। তরে যে এইখানে পামু এইটা আমি ভাবতেই পারি নাই।
সাক্ষাৎ যমদূতের মত সামনে দাঁড়িয়ে মইদুল।বিমানের জীবনটা যেন আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে, যেন একটা বৃত্ত চারদিকে পাক দিতে দিতে ওকে একেবারে বিন্দুতে পরিণত করছে। তবে দেশটা বাংলাদেশ নয়, ভারতবর্ষ এখানে দাঁড়িয়ে মইদুল কিছুই করতে পারবে না। হয়ত কোনো কাজে এখানে এসেছে। তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখার দায় নেই বিমানের। এত শত ভাবনার মাঝে মহিদুল একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ফেলেছিল। লম্বা একটা সিগারেটে টান দিয়ে বিমানে কাছে জানতে চাইলো,
- দেশ থিকা পলাইয়া আইসা এইখানে আস্তানা বানাইছোস! -----পলাইলি ক্যান, আমারে তো কইতে পারতি?
এটা পরদেশ হলেও মইদুলের সামনে কথা বলতে ওর সংকোচ হচ্ছিল বিমানের। তাই খুব আস্তে আস্তে বলল,
- হাবিব ভাই এইভাবে মালপত্র নিয়া টাকা দিব না। এইটা আমি বুঝি নাই। এদিকে তুই আমারে অবিশ্বাস করতাছস। মাঝখানে আমি যামু কই!! আমার নামে একটা কেসও দিলি শুনলাম।
- এসব কথাগুলো বাদ দে এখন। হাবিবের থিকা টাকা তো লইসি-ই, উপরন্তু জমিজমাও লইছি। ভালো কথা, এখানে আমি দশ কাঠা মাটি লইসি।
দোকান ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল বিমান। বুকের ভেতর ভীষন আবেগ এখন এই মুহূর্তে কাজ করছে। আনন্দে কথা বলার চেষ্টা করতে গিয়েও গলা বুজে আসছে ওর। তবুও কোনমতে বলল,
- দোস্ত তুই টাকা পাইছোস এটাই অনেক। তবে আমারে দেশ ছাড়তে হইলো। সব শেষ হইয়া গেল আমার।
- কিছুই শেষ নাই রে পোংটা ব্যাটা। তবে এইখানে থাকলে শেষ হইয়া যাইব। খবর পাস নাই, ইন্ডিয়ার থিকা বাংলাদেশের মানুষ খুইজা খেদাইবো।---- এইখানকার মাটি বেইচ্চা আমিও যামু, তুইও চ।
- কিন্তু আমার নামে যে কেস দিছোস তুই। তার কি হইবো ?
জোরে জোরে হাসতে থাকল মহিদুল।
- আরে আপোইদ্দা, টাকার লাইগ্গা কেস দিসিলাম। টাকা তো পাইয়া গেসি, আর কি কেস থাকবো নাকি হালা? বয়স হইসে তর, কিন্তু বলদামি যায় নাই।
হতভম্ব হয়ে বিমান কিছুক্ষণ মহিদুলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বোকার মত মুখ করে বলল,
- কিন্তু আমার তো পাসপোর্টটা নষ্ট কইরা ফেলাইসি। যামু কেমনে?
বিমানের প্রায় কানের কাছে মুখ এনে মহিদুল বলল,
- ইন্ডিয়াতে নাগরিকত্ব বিল হইয়া ঝামেলার পর থিকা বিএসএফ অনেক টাকা কামাইতাসে। বাংলাদেশের মানুষেরা এখন ইন্ডিয়া ছাইরা দেশে ফিরা যাইতাছে। দশ হাজার টাকায় বিএসএফ একজন কইরা বর্ডার পার করায়। তোর যদি লাগে তাহলে পরশু আমি আসুম,পার করাইয়া দিমু। আমিও আইতাছি এইখানকার মাটি বেইচ্চা।
৫.প্রচন্ড ঝড়-জলের পর পাওয়া এক নিশ্চিন্ত রাত্রি যাপন করছে বিমান আর তার পরিবার। এতদিন দুশ্চিন্তায় ঘুম আসত না। আজ চিন্তার অবসানে আনন্দের রাত্রি জাগরন। রাতের পাখিরা ধীরে ধীরে তাদের বাসায় ফিরে যাচ্ছে কিচিমিচি শব্দ করে। পূব আকাশে সূর্যদেব ধীরে ধীরে পৃথিবীকে আলোকিত করতে আগুয়ান। এ যেন বিমানের জীবনে কালরাত্রি শেষে শান্তির বার্তা এসে হাজির হচ্ছে।
- ব্যাগগুলা গুছাইয়া নাও। হাতে কিন্তু মাত্র একটা দিন। পাওনাদারগো টাকা শোধ দিয়া যামু। যা আছে তাতে কুলাইব তো?
পাশ ফিরে আলেয়া বিমানকে জড়িয়ে ধরল। বহু বছর পর নিজের মানুষটাকে নিজের মতো করে আবার যেন ফিরে পাচ্ছে। মৃদু স্বরে বলল,
-যদি না হয়, আমার একগাছ হার আছে। সেইটা বেইচা যাতায়াত আর ধার শোধ সবই করতে পারবা।
বলা যায় আবার নতুন করে পথ চলা। কাল রাত্রি শেষে নতুন চিন্তায় বিভোর অনেক পরিবারের সাথে বিমানের পরিবার ও। এবার ঘরে ফেরার পালা।
লেখক-সাংবাদিক কলকাতা


crimediarybd1








