মরহুম গোলাম রব্বানী বগুড়ার রাজনীতির এক প্রাণ পুরুষ

মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার ও মরহুমা সেতারা রব্বানী বগুড়ার রাজনীতি, সমাজসেবা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায়

মরহুম গোলাম রব্বানী বগুড়ার রাজনীতির এক প্রাণ পুরুষ
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত

মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার ও মরহুমা সেতারা রব্বানী বগুড়ার রাজনীতি, সমাজসেবা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায়

শরীফা আক্তার স্বর্না:

বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ধনকুন্ডি গ্রাম একসময় যে কজন ক্ষণজন্মা মানুষের কারণে আলোকিত হয়েছিল, মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক ও দূরদর্শী অভিভাবক—যাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও এই জনপদের মানুষের স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হয়।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার আনুমানিক ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ধনকুন্ডি গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানিত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মানিক উদ্দিন সরকার ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন প্রভাবশালী ও সভ্রান্ত জমিদার, যিনি মানুষের কল্যাণ ও ন্যায়বোধে বিশ্বাসী ছিলেন। পারিবারিক সেই মূল্যবোধই গোলাম রব্বানী সরকারের চরিত্র ও কর্মজীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ও বিকাশ

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন। সে সময় বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বগুড়ার কৃতী সন্তান, অবিভক্ত পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। তাঁর সান্নিধ্যে থেকেই গোলাম রব্বানী সরকার রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন।

নিজের সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নেতৃত্বের আসনে উঠে আসেন এবং পরবর্তীতে বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি দলমত নির্বিশেষে মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয়বারের মতো এম.এন.এ নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয়ভাবে সমাদৃত ছিলেন।

সমাজসেবায় অবদান

মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি চান্দাইকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা সে সময় নারীশিক্ষার প্রসারে এক সাহসী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল। পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকার মসজিদ, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সাংসারিক জীবন ও উত্তরাধিকার

তিনি মরহুমা সেতারা রব্বানীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন চার পুত্রসন্তান—

  • গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (সাবেক সংসদ সদস্য),

  • গোলাম মোহাম্মদ শহীদ,

  • গোলাম মানু সরকার,

  • গোলাম মোহাম্মদ হেলাল।

পরবর্তীকালে এই পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে “এস আর পরিবহন” ও “ফুড ভিলেজ”-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন।

মর্মান্তিক পরিণতি

দুঃখজনকভাবে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার অজ্ঞাতনামা আততায়ীর হাতে নিহত হন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু বগুড়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করে।

উত্তরাধিকার ও প্রাসঙ্গিকতা

মরহুম গোলাম রব্বানী সরকার যে সততা, নেতৃত্ব ও জনসেবার আদর্শ রেখে গেছেন, তা আজও শেরপুর–ধুনট অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক। তাঁর পরিবার সেই ঐতিহ্য বহন করে আজও মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে—যা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে একটি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: গোলাম জাকারিয়া কনক
ছবি: মাহফুজ উর রহমান

দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// স্পেশাল