আগুন সন্ত্রাস: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার সামনে এক অগ্নিপরীক্ষা

ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডে জনগণের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কাঠামো ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে

আগুন সন্ত্রাস: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার সামনে এক অগ্নিপরীক্ষা
ছবি- অনলাইন হতে সংগৃহীত
আতিকুল্লাহ আরেফিন রাসেল:
 
বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি  আগুন যেন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বার্তা, প্রতিশোধের হাতিয়ার কিংবা সামাজিক প্রতিবাদের চরম রূপ। অগ্নিসন্ত্রাস এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, মানবিকতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আর তা যদি হয় বিমানবন্দর থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত তবে তো কথাই নেই।

দেশজুড়ে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর পরই নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া ও কুমিল্লায় একাধিক মার্কেট, গুদাম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আগুন লেগে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি কতটা কার্যকর?

ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারাদেশে  ৭৮টি বড় অগ্নিকাণ্ড  ঘটে, যার মধ্যে ১১টি রাজধানীতে। প্রাথমিকভাবে বেশিরভাগ ঘটনায় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও দাহ্য পদার্থের অসতর্ক ব্যবহারকে দায়ী করা হলেও, তদন্ত কর্মকর্তারা কিছু ঘটনায় “সমন্বিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত” পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বিমানবন্দরের ঘটনায় সরকার দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি দুর্ঘটনা হতে পারে। তবে নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কারণ যেভাবে ঘনঘন আগুন লাগছে, তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে অগ্নিকাণ্ডজনিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি।
প্রতিবারই দেখা যায়, কোনো একটি রাজনৈতিক উত্তেজনা, শ্রমিক আন্দোলন, নির্বাচন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ আগুন লাগে বাস, ট্রেন, মার্কেট, গুদাম, বা শিল্পকারখানায়। মানুষ পুড়ে যায়, কোটি কোটি টাকার সম্পদ ছাই হয়ে যায়। অথচ দায় নির্ধারণ বা বিচার তার প্রায় কিছুই হয় না।

আগুন: প্রতিবাদ না প্রতিশোধ?
আগুন সন্ত্রাসের শিকড় রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার অংশ হিসেবে “আগুন” ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্নভাবে। কখনও তা হয়েছে বিরোধী আন্দোলনের “প্রতিরোধের প্রতীক” হিসেবে, আবার কখনও প্রতিপক্ষকে দমন করার রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পেট্রোলবোমায় পুড়ে মারা গিয়েছিল শতাধিক মানুষ। এরপর ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে, ২০২৩ সালে শ্রমিক আন্দোলনের সময়, এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আবারও একই চিত্র ফিরে এসেছে—দাহ্য পদার্থ, পেট্রোলবোমা, ট্রাক-বাসে আগুন, বাজারে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড।
এক সময় যে “আগুন” ছিল প্রতিবাদের প্রতীক, এখন তা পরিণত হয়েছে “ভয়ের রাজনীতিতে”।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতা: প্রশ্নের মুখে সমন্বয়
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পরই তদন্ত শুরু হয়, একাধিক সংস্থা মাঠে নামে—পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, র‌্যাব, সিআইডি, এনএসআই, ডিবি—কিন্তু ফলাফল প্রায় একই। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ধোঁয়াশা, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বা “তদন্তাধীন” অবস্থা বছরের পর বছর থেকে যায়। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা গোয়েন্দা ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা ও তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন “আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহ ভালো হলেও, সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সময়োপযোগী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আগুন লাগার পর সবাই দৌড়ায়; আগেই যদি বিশ্লেষণ হতো, অনেক কিছু রোধ করা যেত।”
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আগুনের সম্পর্ক
নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে সহিংসতার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। তবে ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অতীতের তুলনায় আরও জটিল। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল পরস্পরকে “অগ্নিসন্ত্রাসের দায়ী” বলে অভিযুক্ত করছে। সরকার বলছে, বিরোধীরা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগাচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর দাবি, সরকার নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে “আগুন” ব্যবহার করছে “প্রপাগান্ডা অস্ত্র” হিসেবে।

এতে জনসাধারণ পড়ে বিভ্রান্তির মধ্যে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—“কার লাভ হচ্ছে এই আগুনে?” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগুন এখন কেবল সহিংসতার রূপ নয়, বরং এটি একধরনের **মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যেখানে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাই উদ্দেশ্য।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ: অদৃশ্য ক্ষত
আগুন মানেই শুধু জানমালের ক্ষতি নয়; এটি দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় টিকে আছে—যেসব ব্যবসা বড় বাজার বা গুদামের ওপর নির্ভরশীল। একেকটি বড় মার্কেটে আগুন লাগলে কয়েক হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০২৩ সালের বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫০০০ দোকান পুড়ে যায়; ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায়  ৭০০ কোটি টাকা। এরপর ২০২৪ সালে রাজধানীর নিউমার্কেট, চট্টগ্রাম নিউমুন মার্কেট, ও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট কারখানার আগুন মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এগুলো শুধু দৃশ্যমান ক্ষতি; কিন্তু পরোক্ষ ক্ষতি—বেকারত্ব, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যবসায়িক আস্থা হারানো—এসবের হিসাব অজানা।

প্রযুক্তি ও সন্ত্রাস: ডিজিটাল পরিকল্পনা, অ্যানালগ পরিণতি
বর্তমান যুগে অগ্নিকাণ্ডগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে জটিল প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সিসিটিভি ফিড হ্যাক, ভুয়া ফায়ার অ্যালার্ম, বা দূরনিয়ন্ত্রিত দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের ঘটনা বাড়ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান বলেন, “আগুন লাগানোর আগেই যদি ফায়ার সিস্টেম বা অ্যালার্ম হ্যাক করে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। কিছু ঘটনার পেছনে এই ধরনের ডিজিটাল সাবোটাজের আলামত পাওয়া গেছে।” এই বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, “আগুন সন্ত্রাস” এখন আর কেবল মাঠের সহিংসতা নয় এটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধেরও এক নতুন রূপ।

সামাজিক প্রভাব: আতঙ্ক, অবিশ্বাস ও মানবিক বিপর্যয়
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর হাজারো পরিবার সব হারায়। বস্তি থেকে শুরু করে মার্কেট—যেখানেই আগুন লাগুক না কেন, এর শিকার সাধারণ মানুষ। মানুষের মধ্যে তৈরি হয় ভয়—“আজ যদি মার্কেটে যাই, কাল কি আমি ফিরব?”

শিশুরা আগুনের ভয় নিয়ে বড় হচ্ছে, আর ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের ভয় দীর্ঘমেয়াদে সমাজে  ট্রমা-সংস্কৃতি   তৈরি করে, যেখানে মানুষ বিশ্বাস হারায় রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি। একজন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদার বলেন “আগুনে আমার দোকান গেছে, কিন্তু আমি বিচার চাই না—কারণ জানি, কিছুই হবে না।” এই হতাশাই সবচেয়ে বড় পরাজয়—রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা হারানো।

আইন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ: কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ?
বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস আইন, বিল্ডিং কোড, শ্রম আইন—সবই আছে। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ দুর্বল। বড় বড় শপিং মল বা শিল্পকারখানার অগ্নিনিরাপত্তা সনদ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কেবল কাগজে। ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বছর প্রায় ৭০% ভবনই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই পরিচালিত হয়।

তাছাড়া, অগ্নিসন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের হার অত্যন্ত কম। মামলা হয়, কিন্তু রায় হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অগ্নিসন্ত্রাসীদের আরও উৎসাহিত করছে।
জনগণের ভূমিকা ও সচেতনতা

আগুন প্রতিরোধে নাগরিক ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। বহু সময় দেখা যায়, জনগণের অসচেতনতা—যেমন শর্ট সার্কিটে অসতর্কতা, অবৈধ গ্যাস লাইন, দাহ্য দ্রব্যের অরক্ষিত সংরক্ষণ—অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে যারা আগুন ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, অফিস—সবখানে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

ভবিষ্যতের পথ: প্রযুক্তি, নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
আগুন সন্ত্রাস রোধ করতে হলে শুধু আইন নয়,  প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক নীতি  গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক বাজার, কারখানা ও গণপরিবহনে ওড়ঞ-নির্ভর অগ্নি-সতর্কতা ব্যবস্থা, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের একক ডেটা-প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা দরকার। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক দলগুলোকে “আগুন নয়, আলো”র রাজনীতি শিখতে হবে।

আগুন সন্ত্রাস কোনো রাজনৈতিক দলের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জাতির সমস্যা। যে সমাজে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে আগুন, সেখানে মানবতা ধ্বংস হয় প্রথমে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়া, আর রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব সেই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা অটুট রাখা। যদি এখনই আগুনের রাজনীতি বন্ধ না হয়, তবে আগুন কেবল ভবন নয় আমাদের ভবিষ্যতও পুড়িয়ে ফেলবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি জানিয়েছেন, “আগুন লাগলেই তদন্ত হয়, কিন্তু তার ফলাফল জনগণ জানে না। আমরা চাই একটি জাতীয় অগ্নি-নিরাপত্তা নীতি, যাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে আগুন প্রতিরোধে কাজ করতে পারে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনপূর্ব সময়ে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড কেবল দুর্ঘটনা নয়—বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার পদ্ধতি হতে পারে। তারা বলছেন, “আগুন এখন ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সমন্বিত গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিনির্ভর অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই প্রবণতা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে।
দৈনিক ক্রাইম ডায়রি// জাতীয়