মুজিববর্ষে আমাদের করণীয়

শাহরিয়ার কবির

মুজিববর্ষে আমাদের করণীয়

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২০ ও ২০২১ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দুটি বছর হিসেবে চিহ্নিত হবে। ২০২০-এর ১৭ মার্চ স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী। ২০২১-এর ২৬ মার্চ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে ও বিদেশে তুলে ধরার জন্য সরকার বিশাল কর্মযজ্ঞ ঘোষণা করেছে, যা বাস্তবায়নের জন্য দুটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ভারত ও চীন সহ বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে এই মহান যজ্ঞে নিজেদের যুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এটি সম্ভব হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার কারণে। গত এক যুগ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় না থেকে বাংলাদেশে যদি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় থাকত এতদিনে বঙ্গবন্ধু বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার পক্ষে কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হত।

আমরা সবাই চাই ইতিহাসের এই দুই মহান দিবস সর্বত্র সর্বোচ্চ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হোক এবং বিশ্বের সকল মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষ এই কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করুক। জাতীয় কমিটি নিশ্চয় এ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। তবে একটি বিষয়ে আমরা এখনও সন্দিহান। জাতীয় কমিটি বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনকে যতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে কি ততটুকু গুরুত্ব দেবে?

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচনাবলী ও বিভিন্ন ভাষণে, যার চূড়ান্ত রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি স্বাধীন বাংলাদেশের মূল সংবিধানে। আমার বহু লেখায় উল্লেখ করেছি বঙ্গবন্ধুর জীবনের এবং বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের লিখিত-অলিখিত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন যদি হয় বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় প্রধান অর্জন হচ্ছে সংক্ষিপ্ততম সময়ে জাতিকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান উপহার দেয়া। এই সংবিধান গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-এর ৪ নবেম্বর গণপরিষদে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটি ৭ই মার্চের ভাষণের পর তাঁর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখিত হবে।

৪ নবেম্বরের এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, যা সন্ত্রাস, যুদ্ধ, হিংসা ও বৈষম্যলাঞ্ছিত বর্তমান বিশ্বে মুক্তির সনদহিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি আমরা মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারি। ধর্মের নামে সন্ত্রাস, হানাহানি, ঘৃণা-বিদ্বেষ সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে নির্মূল করতে হলে, বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে হলে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে এই ব্যবস্থাপত্র বঙ্গবন্ধুর ’৭২-এর সংবিধানে পাওয়া যাবে।

’৭২-এর ৪ নবেম্বর গণপরিষদে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের এই সংবিধান যে সমগ্র বিশ্বের যাবতীয় সংবিধানের ভেতর অনন্য স্থান অধিকার করে আছে এ কথা পশ্চিমের সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও স্বীকার করেছন। বিশ্বের কোন দেশ কতটুকু সভ্য ও আধুনিক তা বিচার করবার অন্যতম মানদণ্ড হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ-গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি সেই দেশটির সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং তার প্রয়োগ। বিশ্বের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধানের জনক হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল ১৭৭৬ সালে। মানবাধিকার শব্দটিরও জন্মদাতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যুক্তরাষ্ট্রের একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ‘সেন্টার ফর ইনক্যয়ারি’র পরিচালক ডঃ অস্টিন ডেসি বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষাকবচ হিসেবে বাংলাদেশের ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল গঠনের উপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও নেই। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় মৌলবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।’

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষাকবচ হিসেবে ধর্মের নামে রাজনীতি সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বাইরে অন্য কোন দেশ নিষিদ্ধ করতে পারেনি। এমনকি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিবেশী ভারতের সংবিধানেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। আমাদের দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুছে ফেলার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আলোকাভিসারী একটি জাতিকে মধ্যযুগীয় তামসিকতার কৃষ্ণগহ্বরে নিক্ষেপ করেছেন। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ’৭২-এর মহান সংবিধানের উপর এই নিষ্ঠুর বলাৎকার বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধারার সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আত্মগোপনকারী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক জামায়াতীরা আবার মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ পেয়েছে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং তাদের প্রধান দোসর ’৭১-এর ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রচলন করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা ও ইসলামবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে সব সময় বলে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ধার করেছে। ধর্মব্যবসায়ীদের এই মিথ্যাপ্রচারণা তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে, কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চিহ্নিত শত্র“রাই অধিককাল ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জঘণ্যভাবে বিকৃত করেছে। তারা সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। খালেদা-নিজামীরা এবং তাদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীরা অহরহ বলেন, ’৭২-এর সংবিধান রচিত হয়েছে ভারতের সংবিধানের মডেলে, ধর্মনিরপেক্ষতা নেয়া হয়েছে ভারতের সংবিধান থেকে। এই সব জ্ঞানপাপীরা জানেন না যে, ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সংযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হওয়ার চার বছর পর ১৯৭৬ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সংযোজন করার সময় বঙ্গবন্ধু এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বহুবার বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতি ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে, কোন বিশেষ ধর্মকে প্রশ্রয় দেবে না। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ধর্মের নামে হানাহানি এবং ধর্মব্যবসা বন্ধের জন্যই এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। এতে ধর্ম এবং রাষ্ট্রই দুই-ই নিরাপদ থাকবে।

সেই সময় অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাদের বক্তব্য ছিল সেক্যুলারিজমের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘ইহজাগতিকতা’। ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা যথেষ্ট নয়। সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ প্রদর্শন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কোরাণ, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ, ওআইসির সদস্যপদ গ্রহণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার শিক্ষানীতি প্রণয়নে ব্যর্থতারও অনেক সমলোচনা তখন হয়েছে। পশ্চিমে সেক্যুলারিজম যে অর্থে ইহজাগতিক বঙ্গবন্ধুর সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা সেরকম ছিল না। তাঁর সেক্যুলারিজম ছিল তুলনামূলক নমনীয়, কারণ তিনি মনে করেছেন ধর্মের প্রতি ইউরোপীয়দের মনোভাব এবং বাংলাদেশসহ অধিকাংশ এশীয় দেশের মনোভাব এক রকম নয়। কঠোরভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা অনুসরণ করতে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। হার্ড সেকুলারিজম ইউরোপের কোনও কোনও দেশে সম্ভব হলেও অন্যত্র বঙ্গবন্ধুর ‘সফট সেকুলারিজম’ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রারও সহায়ক হবে।

ইউরোপে যারা নিজেদের সেক্যুলার বলে দাবি করে তারা ঈশ্বর-ভূত-পরলোক কিংবা কোন সংস্কারে বিশ্বাস করে না। বঙ্গবন্ধু কখনও সে ধরনের সেক্যুলারিজম প্রচার করতে চাননি বাংলাদেশে। ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন ও অনীহ কিন্তু একই সঙ্গে এদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপরায়ণ। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে বলতে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়, ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক রাখা প্রয়োজন। কারণ ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বদৌলতে ধর্ম কীভাবে গণহত্যা ও ধর্ষণসহ যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞের সমার্থক হতে পারে। যে কারণে ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি কারও মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। এভাবেই অনন্য হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদান ’৭২-এর সংবিধান।

শাহরিয়ার কবির, লেখক-সাংবাদিক-চলচ্চিত্র নির্মাতা, সভাপতি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।