করোনা মোকাবিলায় সার্ক তহবিল গঠনের প্রস্তাব: ভারতের প্রধানমন্ত্রীর

এক দুই তিন ডেস্কঃ

করোনা মোকাবিলায় সার্ক তহবিল গঠনের প্রস্তাব: ভারতের প্রধানমন্ত্রীর

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সার্ক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাশপাশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেদের সহযোগিতা ও সক্ষমতা বিনিময় এবং সার্ক স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের কনফারেন্সে আয়োজনের প্রস্তাব দেন। সার্কের অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানরাও নিজ নিজ প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরেন।

রবিবার (১৫ মার্চ) দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) নেতাদের ভিডিও কনফারেন্সে এই প্রস্তাব দেন সংস্থাটির নেতারা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে আয়োজিত এই ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবে রাজাপাকসে, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জাফর মির্জা। কনফারেন্সে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ে একমত হন সার্ক নেতারা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘কভিড-১৯ ইমারজেন্সি ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, প্রাথমিকভাবে ভারত ১ কোটি ডলার দিয়ে এই তহবিলের শুরু করতে পারে। এই তহবিলের অর্থ ব্যয় সমন্বয়ের কাজটি ভারতের দূতাবাসগুলো করতে পারে বলেও প্রস্তাব দেন মোদি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্ক দেশগুলোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে এমন একটি ভিডিও কনফারেন্সের প্রস্তাব দেন, যাতে সবাই অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যেন একসঙ্গে কাজ করতে পারে, সেজন্য একটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি। দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সক্ষমতা বিনিময়ের কথাও বলেন তিনি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উপদেষ্টা জাফর মির্জার পক্ষ থেকে সার্ক সেক্রেটারিয়াটে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রস্তাবেও সমর্থন জানায় পাকিস্তান।

শ্রীলংকার প্রেসিডন্ট জরুরি এই পরিস্থিতিতে সার্ক নেতাদের দ্রুত উপায় খোঁজার তাগিদ দিয়ে তার দেশের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা ন্যাশনাল টাস্কফোর্স গঠন করেছি। পাবলিক হেলথ ইনসপেক্টররা কোয়ারেন্টাইনে থাকাদের নজরে রাখছে। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, খেলাধুলাসহ সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ২ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা সব দেশের সঙ্গে অন অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের পরামর্শ দেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। টেলিমেডিসিন সেবার একটি অভিন্ন রূপরেখা প্রণয়নের জন্য সার্ক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান আফগান প্রেসিডেন্ট।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং বলেন, শুধু এই ভাইরাস নয় বরং এর কারণে পরে আমাদের অর্থনীতির ওপর যে আঘাত আসবে, সেক্ষেত্রেও আমাদের একই ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন পড়বে। আমাদের এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিপদেও একে অন্যের সহযোগিতা ও পাশে থাকা প্রয়োজন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জানান, দেশটি সব ধরনের পর্বত আরোহীদের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন প্রস্তাবকে স্বাগত জানান আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের প্রেসিডন্ট।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবসমূহঃ
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য দেশগুলোর জন্য কোভিড-১৯ জরুরি তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় রোববার সার্কের আট দেশের প্রতিনিধিদের ভিডিও কনফারেন্সে এই প্রস্তাব দেন তিনি।

মোদি বলেন, আমাদের সবার স্বেচ্ছা-সহায়তার ভিত্তিতে এই তহবিল গঠন করা যেতে পারে। জরুরি এই তহবিলে প্রাথমিকভাবে ভারত এক কোটি ডলার দিয়ে শুরু করতে পারে।

তিনি বলেন, এই তহবিলের ব্যবহারের জন্য আমাদের দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে কাজ করতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন, পরীক্ষা সামগ্রী এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করছি। তারা সব সময় প্রস্তুত থাকবেন; আপনাদের প্রয়োজন হলে ভারত থেকে তাদের পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ সময় রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে কনফারেন্স শুরু হয়। কনফারেন্সের শুরুতে ভাইরাস থেকে নাগরিকদের সুরক্ষার কৌশল নিয়ে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মোদি বলেন, আমাদের একটি সাধারণ গবেষণা প্ল্যাটফর্মও গঠন করার বিষয়ে ভাবা উচিত। এ ধরনের কাজের সমন্বয়ে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিকেল রিসার্চ সহায়তা করতে পারে। এছাড়া অর্থনীতির ওপর কোভিড-১৯ এর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবের বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা আমাদের সহায়তা করতে পারেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোকে সমন্বয় করে কাজের তাগিদ দিয়ে মোদি বলেন, এই মহামারি প্রথম নয়; এমনকি শেষও নয়।

তিনি বলেন, সার্ক অঞ্চলে বিশ্বের পাঁচ ভাগের একভাগ মানুষ বাস করে। সবাই খুব ঘনিষ্ঠভাবে বাস করে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভারতের অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। আমরা প্রস্তুতি নেব, কিন্তু আতঙ্ক সৃষ্টি করব না।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ভারত সরকারের নেয়া সতর্কতামূলক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, ভারত ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নিয়েছে। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, ৬৬টি ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তিনি কনফারেন্সে আরো বলেন'
ইন্ডিয়ান র‌্যাপিড রেসপন্স টিম, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ এবং পরীক্ষার সরঞ্জামগুলির, যারা ইতিমধ্যে স্ট্যান্ডবাইতে রয়েছেন।

সারা ভারতজুড়ে জরুরি কর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত মডেল ইন্ডিয়া ব্যবহার করে সমস্ত সার্ক দেশগুলির জন্য জরুরি প্রতিক্রিয়া কর্মীদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণের ক্যাপসুলগুলি।
সার্ক রাজ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা এবং সেরা অনুশীলন বিবেচনা করার জন্য এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনের মধ্যে চিকিৎসক এবং চিকিতৎসক পেশাদারদের একটি পর্যালোচনা ভিডিও কনফারেন্স,
সার্কের অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভ্রমণ বিধিনিষেধের প্রভাব বিবেচনা করার জন্য বাণিজ্য কর্মকর্তাদের একটি পর্যালোচনা ভিডিও কনফারেন্স, আমাদের বেশ কয়েকটি অর্থনীতির উচ্চ স্তরের আন্তঃনির্ভরশীলতার স্বীকৃতি প্রদান করে।

সমস্ত সার্ক ভাষায় তথ্যগত তথ্য সহ একটি ওয়েবসাইট প্রস্তুত করতে সহায়তা করা।,
সার্ক অংশীদারদের জন্য রোগের নজরদারি জন্য আমাদের নিজস্ব ইন্টিগ্রেটেড স্বাস্থ্য তথ্য প্ল্যাটফর্মে সফ্টওয়্যার ভাগ করে নেওয়া এবং এই এমআইএস সিস্টেমটি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ।
কোভিড -১৯-এর লড়াইয়ের সেরা অভ্যাসগুলি চিহ্নিত ও জনপ্রিয় করার জন্য সার্ক বিপর্যয় পরিচালন কেন্দ্রের ব্যবহার।

ভবিষ্যতের জন্য: সমস্ত সার্ক রাজ্যের জন্য রোগ এবং মহামারী সম্পর্কিত ডায়াগনস্টিক এবং থেরাপিউটিক হস্তক্ষেপের জন্য ধারণা এবং প্রস্তাবগুলি ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি গবেষণা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার প্রস্তাবিত। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ এটি সমন্বয় করতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব সমূহঃ
সার্কভুক্ত সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের এই ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে পাঁচজন করোনা সংক্রমিত ব্যক্তি এসেছেন। স্থানীয়ভাবে কোনো সংক্রণের ঘটনা পাওয়া যায়নি।
করোনা ভাইরাস এবং এই ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য একটি সংস্থা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রবিবার (১৫ মার্চ) সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীদের এক টেলিকনফারেন্সে তিনি এ প্রস্তাব দেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে এই টেলিকনফারেন্স আয়োজিত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার জন্য একটি ইনস্টিটিউট স্থাপন করা যেতে পারে। যদি সদস্য দেশগুলো রাজি থাকে তবে বাংলাদেশ এই সংস্থা স্থাপনে প্রস্তুত।’
বর্তমান সময়কে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অভিহিত করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের একে অপরকে সহায়তা করতে হবে এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য একটি কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘সমষ্টিগতভাবে আমাদের সক্ষমতা, বিশেষজ্ঞ মতামতসহ অন্যান্য বিষয়ে সবচেয়ে ভালো প্র্যাকটিসগুলো আদান-প্রদান করা যেতে পারে।’ এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে টেলিকনফারেন্সের প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তথ্য আদান-প্রদান করার জন্য তৈরি।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমরা সব ধরনের বন্দর ব্যবহারে সতর্ক আছি। শুধু করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীতে আরেকটি হাসপাতাল আছে, যেখানে শুধু করোনা ভাইরাস রোগের চিকিৎসা হবে। এছাড়া, প্রতিটি জেলায় হাসপাতালগুলোতে একটি ইউনিট রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে মেকশিফট হাসপাতাল তৈরি সম্ভব বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা মোকাবিলায় কৌশলগত বিষয় নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিবরাও এ ধরনের সম্মেলনে আলোচনা করতে পারেন। তিনি বলেন, আমি আশা করছি, এই সম্মেলন করোনা মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে নতুন পথের দিশা দেবে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই সঙ্কট মোকাবিলায় সার্ক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ঘনিষ্ঠ সমন্বয় দরকার। আমাদের বিশেষজ্ঞ অভিজ্ঞতা শেয়ার করা দরকার। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ রসদ সরবরাহ করতে পারে।

শুক্রবার একাধিক টুইট বার্তায় করোনা মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নিতে সার্কের সদস্য দেশগুলোর নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানরা কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন।