লাওস ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং অন্যান্য
হাসান রফিক
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভ্রমণপথে গুরুত্বপূর্ণ এক গন্তব্য লাওস। এখানে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ঠিক তেমনই রয়েছে।
মানুষের কারুকাজ খুব বেশি প্রতিষ্ঠা পায়নি। ফলে প্রকৃতির আসল রূপের স্বাদ নিয়ে লাওস ভ্রমণপিয়াসীদের এক দারুণ গন্তব্য। গোটা দেশে প্রকৃতি তার অপার মহিমা ছড়িয়ে দিয়েছে। এসব সৌন্দর্য আস্বাদনে দেশটির অভ্যন্তরে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে না। চারপাশে দৃষ্টি দিলেই মনটা ভরে উঠবে। সেখানে দেখার আছে অনেক কিছুকমিউনিস্ট শাসিত দেশ লাওস। এটি ইন্দোচীনের অন্তর্ভুক্ত।মালেশিয়ার পাশ্ববর্তী দেশ লাওস। এশিয়ার দেশগুলোর অন্যতম অপার সম্ভাবনার দেশ এটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমিউনিস্ট সরকার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে এখনো দেশটিকে ঠিকভাবে খাপ খাওয়াতে পারেনি। বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি প্রতিবেশী বিশাল দেশ চীনেরও। কেন যেন আপন করে নেয়নি তাদের মাও জে দংয়ের দেশ চীন।
সাগর-মহাসাগেরর সাথে কোনো সংযোগ নেই অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত দেশ লাওস। দণি-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির উত্তর-পশ্চিমে মিয়ানমার ও চীন। পূর্বে ভিয়েতনাম, দক্ষিনে কম্বোডিয়া এবং পশ্চিমে থাইল্যান্ড। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাবাধীনেই থেকেছে দেশটির ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়। এ জন্য লাওস তাদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্কটে ভুগেছে। কম্বোডিয়া, বার্মা, ভিয়েতনাম, চীন এবং শ্যাম নামে পরিচিত থাইল্যান্ড এদের ওপর কর্তৃত্ব করেছে।

বর্তমানে লাওস নামের যে দেশটি তাদের আদি অধিবাসীরা মূলত দক্ষিন চীন থেকে আসে। একাদশ শতাব্দীর পর দেশের একটি অংশ খেমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৩৪৫ সালে প্রথম দেশীয় সরকার কায়েম হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, দেশটির নাম ছিল তখন ‘ল্যান জেং’। এর ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ‘ল্যান্ড অব মিলিয়ন এলিফ্যান্ট’। অর্থাৎ ল হাতির দেশ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ তখন বশ্যতা স্বীকার করেনি। দেশটির নামে (ল্যান জেং) রাজবংশ লাওসের ক্ষমতায়।
এক নজরে লাওস
দেশের নাম : লাও পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক
জনসংখ্যা : ৫৮ লাখ
রাজধানী : ভিয়েনতিয়েন
আয়তন : ৯১ হাজার ৪০০ বর্গমাইল
প্রধান ভাষা : লাও, ফ্রেন্স
প্রধান ধর্ম : বৌদ্ধ
গড় আয়ু : ৫৩ বছর (পুরুষ), ৫৬ বছর (মহিলা)
মুদ্রা : নিউ কিপ
প্রধান রফতানি : বস্ত্র, কাঠ, কফি
মাথাপিছু আয় : ৪৪০ ডলার।
বাংলাদেশ এবং লাওস রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেমনঃ
বাংলাদেশ—লাওস সম্পর্ক বলতে বাংলাদেশের এবং লাওসের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বোঝায়। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৮ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়।

উচ্চ স্তরের পরিদর্শন
২০১২ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি সফরে ভিয়েনতিয়েন যান।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও লাওস একে অপরের সমর্থন করে আসছে। ২০১২ সালে, লাওস এশেমে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সমর্থন করে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বাংলাদেশী ওষুধ, সিমেন্ট, সিরামিক, হালকা প্রকৌশলজাত পণ্য, চামড়া, ইস্পাত এবং কৃষি পণ্যগুলি লাওসে বিপুল চাহিদা সম্বলিত পণ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যথোপযুক্ত পরিবহন সংযোগের অভাব প্রধান সমস্যাগুলির মধ্যে একটি। উভয় দেশ এই পরিবহন সমস্যা সমাধানে কাজ করছে এবং এশিয়ার হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যা এই সমস্যার সমাধান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের যাত্রা শুরুঃ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও লাওসের প্রধানমন্ত্রী থংসিঙ থামাভংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছে।
বৈঠককালে দুই প্রধানমন্ত্রী মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য দুরীকরণ, শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে সম্মত হন।
শেখ হাসিনা লাওস সফরে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য থামাভংকে এবং মনোরম ভিয়েনতিয়েন নগরীতে তাঁকে ও তাঁর সফরসঙ্গীদের লাওস সরকার ও দেশটির জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
লাওসে বাংলাদেশের কোন সরকার প্রধানের ২০১২ সালেই প্রথম সফর। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এ সফর দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। শেখ হাসিনা বলেন, লাওসে তাঁর সফর অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে লাওস ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপর দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ সম্প্রসারণে তাঁর সরকারের লক্ষ্য পূরণ করবে। লাওসের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে চমৎকার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শৃংখলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। এছাড়া তিনি নারী ও যুব সমাজের উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্রঋণ খাতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন।

থামাভং বলেন, লাওস সরকার এ দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।
পরে দু’দেশের কর্মকর্তারা দু’দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের ভিসার প্রয়োজনীয়তা উঠিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দু’দেশের কর্মকর্তারা পারস্পরিক স্বার্থে ভবিষ্যতে দু’দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করতে সম্মত হন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বায়ন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। এ জন্য আমার লক্ষ্য হচ্ছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সঙ্গে লাওস ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সুদৃঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন করা।’
শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার তাঁর সম্মানে লাওসের প্রধানমন্ত্রী থাংসিং থাম্মাভংয়ের দেওয়া এক মধ্যাহ্নভোজে ভাষণ দিচ্ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একই সংস্কৃতি, অভিন্ন মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও শান্তির প্রতি অঙ্গীকার ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে উষ্ণ বন্ধুত্ব বিদ্যমান রয়েছে।
লাওসের প্রশংসনীয় উন্নয়ন ও অন্যান্য অগ্রগতিতে বাংলাদেশ মুগ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বায়নের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কাছাকাছি এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘এই দুই অঞ্চলের সংযোগ হচ্ছে বাংলাদেশ, যা পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী দেশগুলো ও লাওসের নিকটবর্তী। দুই দেশের এই অবস্থান জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে নিজেদের সম্পদের সদ্ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, লাওস বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের যোগাযোগ (কানেকটিভিটি) ও ৩০০ কোটি মানুষের বাজারের সম্ভাব্য সুবিধা নিতে পারে। বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী লাওসের উদ্যোক্তাদের এ দেশে আসার এবং এ সম্ভাবনাকে বিবেচনার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী এএসইএএন আঞ্চলিক ফোরাম ও এএসইএমের সদস্যপদ লাভে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ায় জন্য লাওসকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী লাওসের প্রেসিডেন্টকে বলেন, লাওস বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার, প্রকৌশলী, নার্স, শিক্ষক, আইটি বিশেষজ্ঞ, অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং কৃষি ও নির্মাণ শিল্পের জন্য জনবল নিতে পারে।
লাওস এবং বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্কের উপর ভিত্তি করে ব্যবসা-বাণিজ্য,রপ্তানি ও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জনশক্তি রপ্তানির অপার সম্ভাবনা ও দারুণ সুযোগ রয়েছে।
তথ্যসূত্র :উইকিপিডিয়া ও দৈনিক- অনলাইন পত্রিকা


crimediarybd1








